রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া রেকর্ডসংখ্যক আসনে জয় পেয়েছে। তিন দিনব্যাপী নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ৪৫০ আসনের ডুমায় দলটি ৩৫৫টি আসন পেয়েছে। এর ফলে পার্লামেন্টে দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও বেড়েছে।
সোমবার রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এলা পামফিলোভা এ ফল ঘোষণা করেন। এর আগে স্টেট ডুমায় ইউনাইটেড রাশিয়ার সর্বোচ্চ আসন ছিল ৩৪৩টি। এবারের ফল সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
৩৫৫টি আসন পাওয়ায় ইউনাইটেড রাশিয়া এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যা প্রয়োজন হলে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। গত ২৫ বছর ধরে রাশিয়ার রাজনীতিতে দলটি প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন
২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই ছিল রাশিয়ায় প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। তবে নির্বাচনে ক্রেমলিনের সমালোচক ও ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো একটি দলকেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
ক্রেমলিন নির্বাচনের ফলকে রুশ জনগণের ঐক্যের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ফলাফল রাষ্ট্রপ্রধান পুতিনকে ঘিরে রুশ সমাজে ‘সর্বোচ্চ মাত্রার সংহতি’র ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৯৯৯ সালের শেষ দিক থেকে রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পুতিন। ইউক্রেন যুদ্ধ কয়েক বছর ধরে চলমান রয়েছে। যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক অভিযান নিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সমালোচনার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ভোটার উপস্থিতি ৫৯ শতাংশের বেশি
রাশিয়ার নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫৯ শতাংশের বেশি ছিল। এলা পামফিলোভা বলেন, রাশিয়ার ওপর ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ থাকা সত্ত্বেও মানুষ ভোট দিয়েছে।
নির্বাচনের শেষ দিনে ইউক্রেন মস্কোর ওপর বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালায়। এতে দুজন নিহত হন এবং একটি তেল শোধনাগারে আগুন ধরে যায় বলে রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
পামফিলোভা বলেন, ‘চরম পরিস্থিতির’ মধ্যেও সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসাও করেন তিনি।
পুতিনের ক্ষমতা আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা
নির্বাচনের ফল পুতিনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ায় নতুন করে সেনা সমাবেশের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে পুতিন এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া নতুন করে সেনা নিয়োগের ঘোষণা দিতে পারে।
ইউনাইটেড রাশিয়ার পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি—৪০টি। জাতীয়তাবাদী এলডিপিআর পেয়েছে ২৫টি এবং নিউ পিপল পার্টি পেয়েছে ২০টি আসন।
ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের কোনো স্পষ্ট পথ এখনো দৃশ্যমান নয়। এ কারণে নির্বাচনটি যুদ্ধ নিয়ে রুশ জনগণের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চেচনিয়ায় কাদিরভের বড় জয়
রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক প্রধান নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ চেচনিয়ায় দীর্ঘদিনের নেতা রমজান কাদিরভ ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে।
চেচনিয়ায় কাদিরভের বিরোধিতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাঁর শাসনামল নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে পুতিনের রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেকে নির্বাসনে, কারাগারে রয়েছেন অথবা মারা গেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনি, যিনি ২০২৪ সালে আর্কটিক অঞ্চলের একটি কারাগারে মারা যান।
ইইউর সমালোচনা
রাশিয়ার নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। তিনি নির্বাচনকে ‘তথাকথিত’ নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, ক্রেমলিন ভিন্নমত দমন করেছে, ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধী একটি নিবন্ধিত দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি।
কালাসের ভাষ্য, রাশিয়ায় গণতন্ত্রের কেবল বাহ্যিক কাঠামোটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে।
সূত্র: ডন







