জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সরকার বাসের ভাড়া বাড়িয়েছে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাসকর্মীদের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ঢাকা মহানগরে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে কাগজে-কলমে ভাড়া বেড়েছে ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। কিন্তু বিভিন্ন রুটে বাস্তবে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের ক্ষেত্রে প্রকৃত ভাড়া বৃদ্ধির হার রুটভেদে ২৫ থেকে ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে।
গত রোববার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর পরদিন থেকেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বাসের নতুন ভাড়া কার্যকর করার কথা জানানো হয়।
বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া
বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধানমন্ডি ১৫ নম্বরের বাসস্ট্যান্ড থেকে রমজান পরিবহনের একটি বাসে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে যান এই প্রতিবেদক। প্রায় ৬ কিলোমিটারের এই পথে আগে ভাড়া ছিল ২০ টাকা। তবে গতকাল চালকের সহকারী ২৫ টাকা করে ভাড়া আদায় করেন।
এ সময় কয়েকজন যাত্রী ২০ টাকার বেশি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের সঙ্গে বাসকর্মীর বাগ্বিতণ্ডা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলনামূলক কম ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল।
রমজান পরিবহনের ওই বাসের চালকের সহকারী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বিভিন্ন দূরত্বে বাসের ভাড়া ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। তার ভাষ্য, জ্বালানির পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে তাঁদের মতো শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভাটারার নতুনবাজার থেকে ভিক্টর পরিবহনের বাসে গুলিস্তানে আসা সিরাজুল ইসলাম জানান, সাধারণত তাঁর কাছ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও গতকাল ৪০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
পরে পল্টন মোড় থেকে কারওয়ান বাজার যাওয়ার জন্য ওয়েলকাম পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন এই প্রতিবেদক। এ পথে সাধারণত ১০ টাকা ভাড়া হলেও চালকের সহকারী ১৫ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়।
কারওয়ান বাজারে এক যাত্রী জাহানারা বেগম বলেন, গতকাল অনেক বাসেই ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হয়েছে।
একাধিক যাত্রীর অভিযোগ, মৌমিতা ও ঠিকানা পরিবহনেও রুটভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। মৌমিতা পরিবহনের বাস নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা এবং ঠিকানা পরিবহনের বাস সাইনবোর্ড থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত চলাচল করে।
‘এক পয়সাও বেশি নেওয়া যাবে না’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক পয়সাও বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিআরটিএ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়
বিআরটিএর হিসাবে, ঢাকা শহরে অনুমোদিত বাসের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। এসব বাস প্রায় ৩০০টি কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হয়। মালিকের সংখ্যা প্রায় চার হাজার।
পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাস পরিচালনার প্রচলিত ব্যবস্থার কারণেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে মালিক বা কোম্পানি চালকদের নির্দিষ্ট দৈনিক চুক্তিতে বাস পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। আবার কোথাও শ্রমিকেরা দৈনিক ভিত্তিতে বাস ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করেন। নির্ধারিত খরচ বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট আয় চালক ও ভাড়া আদায়কারীদের মধ্যে ভাগ হয়।
তাদের মতে, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপও বাসকর্মীদের ওপর পড়ে। এর সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, বাস ভাড়া করে চালানোর বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিপর্যায়ে হয়ে থাকে, এতে সমিতির সরাসরি ভূমিকা নেই। শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল স্বচ্ছভাবে পরিচালনার জন্য নতুন আইন হয়েছে এবং সবাইকে তা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভাড়া তালিকা ও বাসের পরিচয় দৃশ্যমান করার পরামর্শ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, প্রতিটি বাসের ভেতরে দৃশ্যমান স্থানে বাসের নাম ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর টাঙানো থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকাও প্রদর্শন করতে হবে।
তার মতে, এসব তথ্য দৃশ্যমান থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীরা সহজেই সংশ্লিষ্ট বাসের পরিচয় উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। এতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।
পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া বাড়ানো নতুন ঘটনা নয়। তবে সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হলে এর চাপ সরাসরি পড়ে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের যাত্রীদের ওপর। কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান ছাড়া এ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।







