ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় পোশাক পরার কারণে এক শিক্ষার্থীকে হেনস্তার অভিযোগে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন শিক্ষার্থীরা। অভিযোগের পর তাকে সব ধরনের ক্লাস কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনাটি নিয়ে এরই মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মল্লিকার অভিযোগ, নেকাব পরার কারণে ওই শিক্ষক তাকে বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করেন এবং অস্বস্তি প্রকাশ করে ক্লাসে অন্যদের সঙ্গে গিয়ে বসতে বলেন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মল্লিকা জানান, একটি ক্লাসে তিনি শিক্ষকের ডেস্কের বাঁ পাশে বসেছিলেন। কয়েকবার চোখাচোখি হওয়ার পর শিক্ষক তাকে উদ্দেশ করে বলেন, তাকে দেখে তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন। এরপর তার পোশাক ও নেকাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এটি কোন ফিকহে রয়েছে ও ইসলামের কোথায় বলা হয়েছে—এমন প্রশ্ন করেন। এ সময় শিক্ষক হজ করে আসার বিষয়টিও উল্লেখ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মল্লিকার দাবি, একপর্যায়ে শিক্ষক তাকে বলেন, তিনি ওই জায়গায় বসে থাকলে নিজেকে অনিরাপদ মনে করছেন এবং তাকে অন্য শিক্ষার্থীদের ভিড়ের মধ্যে গিয়ে বসতে বলেন। পরে তিনি ক্লাস থেকে বের হয়ে যান।
এটি প্রথম ঘটনা নয় বলেও অভিযোগ করেন মল্লিকা। তার ভাষ্য, এর আগের একটি ক্লাসেও শিক্ষক তাকে নেকাব পরে এভাবে চলাফেরা করলে তা খুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। শিক্ষকের এমন আচরণকে তিনি ধারাবাহিকভাবে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে আপত্তি প্রকাশের অংশ হিসেবে দেখছেন।
মল্লিকা আরও বলেন, পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে তিনি শিক্ষকের অফিস সময়ে গিয়ে মুখ দেখাতে এবং পরিচয়পত্র দেখাতে রাজি ছিলেন। তার সহপাঠী ও ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা তাকে চেনেন বলেও জানান তিনি। তবে শিক্ষক প্রতিদিন তাকে পরীক্ষা বা যাচাই করতে পারবেন না বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন মল্লিকা।
তার অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ থেকে নেকাব বা এ ধরনের পোশাক নিষিদ্ধ করার কোনো নির্দেশনা নেই। তারপরও ওই শিক্ষকের ক্লাসে বারবার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে।
ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমিও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাসে ইসলামবিরোধী মন্তব্য করার অভিযোগ করেন। তার দাবি, শিক্ষক নিয়মিতভাবে পর্দা, মাযহাব ও ইসলামি অনুশাসন নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে নেকাব পরার বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
সুমির ভাষ্য, তিনি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পক্ষে কথা বললে শিক্ষক ক্ষুব্ধ হন। মাযহাব অনুসরণের প্রসঙ্গ উঠলে শিক্ষক কোনো মাযহাব না মানার কথা বলেন এবং ইসলামি অনুশাসনের মধ্যে হজ, নামাজ, রোজা ও জাকাত পালনের কথা উল্লেখ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
সুমি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে ওই শিক্ষক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং সে বোমা হামলা করতে পারে—এমন মন্তব্যও করেন। এতে শ্রেণিকক্ষে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে জানান তিনি।
তার দাবি, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পোশাক নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং কে কতটুকু পর্দা করবে, তা নিয়ে মন্তব্য করেন। এ সময় অনেক শিক্ষার্থী অস্বস্তি বোধ করে ক্লাস থেকে বের হয়ে যান বলেও জানান সুমি।
অভিযুক্ত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন সুমি। তার ভাষ্য, শিক্ষক নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দাবি করে বলেছেন, তার কোনো ক্ষতি করা সম্ভব নয় এবং কেউ তার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারবে না। শিক্ষার্থীদের ওপর এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি চাপ সৃষ্টি করেছেন বলেও অভিযোগ করেন সুমি।
অভিযোগগুলো নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হলে তারা লিখিত অভিযোগ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজি বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।







