৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও সরকারি গেজেটে নাম আসেনি বগুড়ার ফাহিম ফয়সালের। চার বছর ধরে প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম ও অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত চাকরিতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখলেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগের তালিকায় স্থান পাননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
ফাহিম ফয়সালের বাড়ি বগুড়া মহানগরের কাটনারপাড়া এলাকায়। ৪৫তম বিসিএসের মেধাতালিকায় তাঁর অবস্থান ছিল ৪০তম। তাঁর দাবি, নিজের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই এবং তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না। তারপরও কী কারণে তাঁর নাম নিয়োগের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সে বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি।
ফাহিম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতাম। মা-বাবা ভেঙে পড়েছেন। আমার মনের অবস্থাও ভালো নেই। আমি এই কয়েক বছরে অন্য চাকরির জন্যও চেষ্টা করিনি।’
ফেসবুকে আবেগঘন পোস্ট
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ৪৫তম বিসিএসে নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানে নিজের নাম না দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন ফাহিম। পোস্টে তিনি তাঁর বাদ পড়ার কারণ স্পষ্ট করার দাবি জানান।
ফাহিম লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। সহকারী পুলিশ সুপার (সুপারিশপ্রাপ্ত)। ঠিক কোন অপরাধে আমাকে গেজেট বঞ্চিত করা হলো, জানি না। রাষ্ট্রের সেটা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে, যেন তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। আর যদি কোনো অপরাধ না থাকে, আমাকে আমার প্রাপ্য সুযোগ দেওয়া হোক।’
প্রথম বিসিএসেই পছন্দের ক্যাডারে সুপারিশ
বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতাও পোস্টে তুলে ধরেছেন ফাহিম। তিনি জানান, স্নাতকের ফল প্রকাশের আগেই ২০২২ সালে ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। প্রথমবার বিসিএসে অংশ নেওয়ায় তাঁর মধ্যে ছিল বাড়তি আগ্রহ ও আবেগ। কাঙ্ক্ষিত ক্যাডারে সুপারিশ পেতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রথম বিসিএসেই পছন্দের পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ায় পরবর্তী বিসিএসের প্রস্তুতি আর এগিয়ে নেননি ফাহিম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসেও অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিলে অন্য চাকরিতেও সুপারিশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। তবে অন্য চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগের কথা বিবেচনা করে তিনি আর সেদিকে এগোননি।
এ প্রসঙ্গে ফাহিম লেখেন, ‘প্রথম বিসিএসে পছন্দের ক্যাডার পেয়ে যাওয়ায় আর কোনো বিসিএসে অগ্রসর হইনি। আমারও পাইপলাইনে ৪৬, ৪৭ ছিল। ভাইভা/রিটেন দিলে যে প্রিপারেশন ছিল, হয়তো আরও চাকরি পেতাম। বেকারদের কথা মাথায় রেখে কাউকে বঞ্চিত করতে চাইনি। সেই আমিই আজ বঞ্চিত।’
চার বছরের পরিশ্রমের পরও অনিশ্চয়তা
২০২২ সালে বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে ফাহিমকে। সব ধাপ পেরিয়ে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগ না হওয়ায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
ফাহিমের ভাষায়, ‘২০২২ থেকে ২০২৬, চারটি বছর পর এই বিসিএসের সব ধাপ পার করে আজ আমি খালি হাতে ফিরছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স মাস্টার্স করে বিদেশ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে আমি মনে করতাম। যদিও কাছের অনেকেই আমাকে বারবার সতর্ক করেছিল—এদেশে মেধার মূল্য নাই। ভালো থাক বাংলাদেশ।’
৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে বাদ ১০৫ জন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ ৩২২ দিনের অপেক্ষার পর বুধবার ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এতে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ১০৫ জন।
২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ২ হাজার ৩০৯টি শূন্য পদের বিপরীতে ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষ হতে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় লাগে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর ক্যাডার পদে ১ হাজার ৮০৭ জনকে সাময়িকভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে ফল প্রকাশ করে পিএসসি। তাঁদের মধ্যে বুধবার ১ হাজার ৭০২ জনের নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার।
চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও গেজেটে নাম না থাকায় ফাহিম ফয়সালের মতো একাধিক প্রার্থী এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। তবে ফাহিমের ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে নিয়োগের গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।







