আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দল আবারও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাদের অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি পালন করছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়েছেন সরকার-নিযুক্ত জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালক।
পতনের পর আবারও সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর উদীচীর অধিকাংশ সংগঠক আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনটির নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে আবার সংগঠিত হতে শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত উদীচীকে প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও মাঠে সক্রিয় হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে দলটির একটি মিছিল শুরু হলে রাজধানীর পল্টনে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাতে বাধা দেন।
নিমচন্দ্র ভৌমিকের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অংশগ্রহণও আলোচনায় এসেছে। সংগঠনটির সাবেক সভাপতি নিমচন্দ্র ভৌমিকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সমালোচনা করেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজের পাগুলো উপরে উঠে গেছে, আর মাথাগুলো নিচে পড়ে গেছে। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্ঞানী-গুণী মানুষের জন্ম হতো, অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ বৃহৎ মাদরাসায় পরিণত হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীসের লেখাপড়া? এখানে তো কারো ভর্তি হওয়া উচিত না। অমানুষদের একটা জায়গা হয়েছে এটা।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় এবং ১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নিমচন্দ্র ভৌমিকের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছর বেঁচে থেকে তিনি দেখে যেতে চান, বাংলাদেশ বাঙালির দেশ হিসেবে থাকবে, নাকি স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে পাকিস্তানে পরিণত হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলা ভাষা, বাঙালি পরিচয় ও আদিবাসী সংস্কৃতি রক্ষা করা না গেলে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের চেতনা ধরে রাখা সম্ভব হবে না। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারও উপস্থিত ছিলেন।
নেপালে রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন বিতর্ক
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে নিমচন্দ্র ভৌমিক নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের একাধিক অভিযোগ ওঠে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্যবহারের জন্য মার্সিডিজ-বেঞ্জ গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি মোটরসাইকেলে যাতায়াত করে ড্যান্সবারে যেতেন বলে নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া কাঠমান্ডুতে ভারতীয় কূটনীতিক অপূর্ব শ্রীবাস্তবকে বারবার উত্ত্যক্ত করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে। একপর্যায়ে ওই নারী কূটনীতিকের বাসায় প্রবেশের চেষ্টা করলে দারোয়ান তাকে বাধা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরও তিনি বাসার সামনে গাড়িতে বসে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বলিউড অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার বাড়িতে গিয়েও উপদ্রব করার অভিযোগ উঠেছিল নিমচন্দ্র ভৌমিকের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নেপালের পররাষ্ট্র সচিব ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানান বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পরে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ার পর তাকে নেপাল থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরবর্তী সময়ে তার নিয়োগ বাতিল করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
নিমচন্দ্র ভৌমিকের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ যতটা এগিয়ে গিয়েছিল, দেশ আজ সেখান থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে সমালোচিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংগঠকেরা দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর সাংবাদিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আবারও সক্রিয় হচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সিপিবির নেতাদের উপস্থিতি
দেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও সিপিবির নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিবেদনটি। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত দলটির নেতারা বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন টকশোতে নিয়মিত আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ টেলিভিশনের দুটি টকশোর অতিথিদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুটি অনুষ্ঠানে সিপিবির নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে মৌলবাদ দমনের নামে সংঘটিত গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতি সিপিবির নেতারা সমর্থন জানিয়েছিলেন।
বেসরকারি গণমাধ্যমেও রাজনৈতিক বয়ান তৈরির অভিযোগ
অন্যদিকে, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রগুলোতে আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারক হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের অভিযোগ, এসব আলোচক বিভিন্ন গণমাধ্যমে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে বয়ান তৈরি করছেন। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কারাগারে ছিলেন।
সব মিলিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।







