গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা প্রায় সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও, বহুল প্রতীক্ষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সব দলের স্বাক্ষর এখনো পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের এই রূপরেখা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার আগেই স্বাক্ষরপর্ব শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মতভেদ দেখা দিয়েছে।
স্বাক্ষরে অনীহা ও আপত্তি
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদ বাস্তবায়নের আদেশ ও কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ খসড়া না দেখে সই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একইভাবে সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ—এই চারটি বাম দলও নিজেদের আপত্তি জানিয়ে সনদে সই করেনি।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার দাবি তুললেও শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষর করে। ফলে নির্ধারিত ৩০ দলের মধ্যে ২৪টি দল সই করে, পরে গণফোরাম যুক্ত হয়।
অভ্যন্তরীণ মতভেদ ও কমিশনের ভূমিকা
ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার পরও দলগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও আইনি কাঠামো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও কমিশন ৮৪টি প্রস্তাব ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করে স্বাক্ষরের আয়োজন করে।
শেষ মুহূর্তে চারটি বাম দলের সাত দফা আপত্তি নিষ্পত্তির প্রস্তাব এবং এনসিপির জন্য বাস্তবায়নের বিশেষ আদেশ জারি করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবুও এনসিপি সই করেনি।
বিএনপি খুশি, অন্যদের ক্ষোভ
বিএনপি সনদে স্বাক্ষর করায় সন্তুষ্ট থাকলেও, বাম দলগুলো ও এনসিপির মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্বাক্ষরের দিন অভিযোগ করেন, “কিছু দল জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে জুলাই সনদে সই করেছে।”
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেদিনের ঘটনাকে “ঐতিহাসিক” অভিহিত করে বলেন, ঐক্যের মধ্য দিয়েই দেশ এগিয়ে যাবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জুলাই সনদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।”
জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সতর্ক করে বলেন, “সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব জাতির সঙ্গে গাদ্দারি হবে।”
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্তকরণ
ঐকমত্য কমিশন বর্তমানে সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও আইনি ভিত্তি চূড়ান্ত করছে। কমিশনের মেয়াদ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানকে ভিত্তি ধরে “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ” জারি করা হবে, যার সঙ্গে গণভোটের অধ্যাদেশ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ আদেশের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে পরবর্তী সংসদের অধীনে তা সংবিধান সংস্কার পরিষদে স্থান পাবে। কমিশন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—অক্টোবরের মধ্যেই আদেশ জারি করা হলে এনসিপিসহ সব দলের স্বাক্ষরের পথ খুলে যাবে।
বৈঠক ও নতুন প্রস্তাবনা
গত সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি আলাদা বৈঠক করে। বিএনপির বৈঠকে নির্বাচনি ইস্যু প্রধান আলোচ্য হলেও, জামায়াত ও এনসিপি প্রস্তাব দেয়—সনদ বাস্তবায়নের আদেশ রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে প্রধান উপদেষ্টার মাধ্যমে জারি করা হোক।
জামায়াত নভেম্বরেই গণভোট চায়, যাতে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হয়। এনসিপি বলেছে, জুলাই সনদের অনুমোদন শুধুমাত্র গণভোটের মাধ্যমেই হবে, এরপর সংসদীয় কাঠামোতে নতুন সংবিধান রচনা করা হবে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত বছর স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর জনগণের বিশাল প্রত্যাশার প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেন, পরে তা বাড়িয়ে ১৫-এ উন্নীত হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনূস, সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এই কমিশনের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নির্ধারণ, যা এখন ‘জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনের প্রস্তাব সব দল গ্রহণ না করলে আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ঘোষণার পর মতভেদের সমাধান না হলে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হতে পারে। অন্যথায় নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
🔍 সারসংক্ষেপে:
-
সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও স্বাক্ষর নিয়ে বিভাজন স্পষ্ট।
-
বাস্তবায়নের আইনি কাঠামো ও পদ্ধতি নিয়ে মতভেদই মূল জট।
-
ঐকমত্য কমিশন চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করছে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে।
-
গণভোট ও নতুন সংবিধান রচনার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
-
রাজনৈতিক দলগুলো এখন অপেক্ষায়—সরকারি আদেশ ও কমিশনের সুপারিশের দিকে।
