বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাকে ঘিরে বিতর্ক ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে প্রথমে বিএনপি এবং পরদিন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্দিষ্ট কিছু উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বিএনপির অভিযোগ: উপদেষ্টা পরিষদে পক্ষপাত
মঙ্গলবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের শীর্ষ নেতারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করেন।
তাদের দাবি, প্রশাসন ও পুলিশে বদলি–পদায়নে কিছু উপদেষ্টা জামায়াতের স্বার্থে কাজ করছেন।
বিএনপির দেওয়া তথ্যে জানা যায়, বিতর্কিতদের তালিকায় রয়েছেন—
-
জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান,
-
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব শেখ আব্দুর রশিদ,
-
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী,
এবং ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে থাকা উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
দলটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে এদের সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধও জানায়।
তবে অভিযুক্তদের কারও মন্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, “যেহেতু বড় সব দলই অভিযোগ করছে, তাই বোঝা যায় সরকার ঠিক পথেই চলছে।”
বিএনপির দাবি: ‘তত্ত্বাবধায়ক মডেলে’ কাজ করুক সরকার
বৈঠকে বিএনপি নেতারা বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধাঁচে পরিচালিত হয়।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সরকারের এখন একমাত্র অগ্রাধিকার হবে নির্বাচন আয়োজন। তাই এটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতোই কাজ করা উচিত।”
জামায়াতের অভিযোগ: প্রশাসনে বিএনপি প্রভাব
পরদিন বুধবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে জামায়াতের প্রতিনিধি দলও একই ধরনের অভিযোগ তোলে, তবে এবার লক্ষ্য বিএনপি।
দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের জানান, তারা এখনো কোনো উপদেষ্টার নাম প্রকাশ করেননি, তবে প্রয়োজনে তা করা হবে।
জামায়াত ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, তারা বিশেষভাবে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট, যিনি প্রশাসন–সংক্রান্ত কেবিনেট কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন।
এনসিপির অভিযোগ ও উদ্বেগ
একই দিনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বড় দলগুলো প্রশাসনে বদলি–পদায়নে “ভাগ–বাঁটোয়ারা” করছে, আর কিছু উপদেষ্টা সেখান থেকে সহায়তা দিচ্ছেন।
এনসিপির আরও আশঙ্কা—অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো পরিবর্তন হতে পারে। তবে প্রধান উপদেষ্টা তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বেই অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্লেষকদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “বড় দলগুলোর নজর এখন প্রশাসনে। নিজেদের প্রভাব বাড়াতে তারা উপদেষ্টাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে—এটাই চাপ সৃষ্টির কৌশল।”
তাঁর মতে, এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সরকার ও দলের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়াতে পারে এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও ঘনীভূত করবে।
পটভূমি: তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু ফের আলোচনায়
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ২০১১ সালে সংবিধান থেকে বাতিল করা হয়।
তবে জুলাই মাসের গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাইকোর্ট আদেশে এটি সাময়িকভাবে পুনর্বহাল হয়।
এখন সেই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল শুনানি চলছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর তারই মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দেশের রাজনীতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
