ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে একাধিকবার ‘অস্ত্র উদ্ধারের নাটক’ মঞ্চস্থ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তসংলগ্ন চুনারুঘাট উপজেলার ২৪৩ হেক্টরজুড়ে এ বনে র্যাব নয় দফা অভিযান চালায়।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিতে এসব ‘উদ্ধার অভিযান’ সাজানো হতো বলে দাবি সচেতন মহলের। উদ্ধার দেখানো হতো ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ, কিন্তু এর উৎস বা উদ্দেশ্য কখনও প্রকাশ পায়নি। চুনারুঘাট থানায় অন্তত ১০টি মামলা হলেও কোনো ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়নি।
অনেকে মনে করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুগ্রহ পেতে এবং র্যাবের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এই সাজানো নাটকগুলো করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক প্রশ্ন ও বিতর্ক
২০১৪ সালে প্রথম অস্ত্র উদ্ধারের পর থেকেই এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর র্যাবের এসব অভিযান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
সেই সময় বিবিসি বাংলার এক আলোচনায় উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার মন্তব্য করেন, “র্যাবের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং ভারতের নতুন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণই এসব অস্ত্র উদ্ধারের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।”
তৎকালীন বিএনপি উপদেষ্টা আহমেদ আজম খানও বলেন, “র্যাবের ভাবমূর্তি ফেরাতে সরকারের পরিকল্পিত নাটক ছিল এই অস্ত্র উদ্ধার।”
মোদি শপথের পরপরই অভিযান
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদি ২৬ মে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার ছয় দিন পরই ১ জুন র্যাব সাতছড়ি উদ্যানে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান চালায়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন র্যাব গোয়েন্দা প্রধান কর্নেল জিয়াউল আহসান, যিনি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে তিনি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি। তার বিরুদ্ধে গুম-খুন, ফোনে আড়িপাতা এবং ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ডসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
সাতছড়িতে যতবার অস্ত্র উদ্ধার
২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অন্তত নয়বার অভিযান চালানো হয় সাতছড়ি উদ্যানে। এসব অভিযানে র্যাব ও বিজিবি দাবি করে, রকেট লঞ্চার, মেশিনগান, রাইফেল, হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ও বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
কিন্তু কোনো ঘটনাতেই আসামি শনাক্ত বা অস্ত্রের উৎস জানা যায়নি। তদন্তে একবার উল্লেখ করা হয়েছিল, অস্ত্রগুলো ২০–২৫ বছর আগে ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী টিপিডিএফ এ স্থানে মজুত করে রেখেছিল।
তবে পরে আর কোনো নতুন তথ্য বের হয়নি, এবং মামলাগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, র্যাব প্রতিবার অভিযান পরিচালনার সময় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের ঢুকতে দেয়নি; বরং ঢাকাসহ নির্দিষ্ট সাংবাদিকদের নিয়ে গিয়ে সংবাদ প্রচার করত। এতে অভিযানগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
চুনারুঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমি সম্প্রতি এখানে যোগ দিয়েছি। পুরনো এসব মামলার অগ্রগতি খতিয়ে দেখছি।”
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার এএনএস সাজেদুর রহমান জানান, “বর্তমানে এ সংক্রান্ত কোনো সক্রিয় মামলা নেই। তবে সাতছড়িতে বিশেষ নজরদারি রয়েছে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।”







