ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই নতুন দলটি কোন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে নির্বাচনে যাবে—সে সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত পর্যায়ে। এনসিপিকে নিজেদের দিকে টানতে চাইছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—দুই পক্ষের সঙ্গেই সমান্তরালভাবে আলোচনা চালাচ্ছে দলটি।
আগামী সংসদে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এনসিপি বর্তমানে জামায়াতকে পাশে রেখে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে আগ্রহী বিএনপি ও জামায়াত। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মাধ্যমে এনসিপির সঙ্গে দুই দলের যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে এনসিপির মূল লক্ষ্য—সংসদে বিপ্লবী শক্তির কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। আর বিএনপি ও জামায়াত চাইছে এই তরুণ শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনী মাঠে বাড়তি সুবিধা নিতে। তবে এনসিপি হিসাব-নিকাশ করেই এগোচ্ছে, বেশি আসন আদায়ের কৌশল নিয়েই তাদের আলোচনা।
নির্বাচনি আসন সমঝোতা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আলোচনা এখন প্রায় শেষ ধাপে। চলতি সপ্তাহে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিএনপি-এনসিপির আলোচনা চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে বলে জানা গেছে। ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললে জামায়াতের সঙ্গে চলমান আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। তবে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা না হলে জামায়াতের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এনসিপিসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে বিএনপির আলোচনা চলমান রয়েছে।
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্য সচিব আমার দেশ–কে বলেন, তারেক রহমান দেশে এলে আসন সমঝোতার আলোচনা চূড়ান্ত দিকে যেতে পারে। বিএনপি বা জামায়াত—যে কোনো পক্ষের সঙ্গেই সমঝোতা হতে পারে। অন্যথায় এনসিপি নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট নিজস্ব পথে এগোবে। এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
এনসিপির রাজনৈতিক লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে জোট কিংবা আসন সমঝোতা নিয়ে এখনো নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি। অফিসিয়াল ও আনঅফিসিয়াল—দুই পর্যায়েই আলোচনা চলছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এনসিপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নির্বাচন হওয়ায় গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিপ্লবী শক্তির প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই আধিপত্যের রাজনীতি বহাল থাকলে সংসদে বিপ্লবীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। জুলাই বিপ্লবের চেতনা এগিয়ে নিতে ও আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াই জোরদার করতে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তরুণদের সমান্তরাল ভূমিকা প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই শক্তির ওপর ধারাবাহিক হুমকি বিপ্লবী নেতৃত্বকে গভীর নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক ভয়ের সংস্কৃতি নতুনভাবে ফিরে আসছে। এই বাস্তবতায় এনসিপিকে নতুন করে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হচ্ছে। প্রধান দুই দলকে বাস্তবতা অনুধাবনের আহ্বান জানানো হয়েছে; সাড়া না মিললে এনসিপি নিজস্ব পথে অগ্রসর হবে।
গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটের সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে। জোটের অন্তত দুটি দলের তৃণমূল নেতারাও সমঝোতাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এতে আসনসংখ্যা বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও শঙ্কাও রয়েছে। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা হলে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেন। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় সে ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
একাধিক সূত্র জানায়, গণতান্ত্রিক সংস্কার জোটে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল যুক্ত হওয়ার আলোচনা চলছে, যা চলতি সপ্তাহেই চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর বিভিন্ন আসনে সমন্বিত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধিত এনসিপির ‘শাপলা কলি’ অথবা এবি পার্টির ‘ঈগল’—এই দুই প্রতীকের একটিতে জোট প্রার্থীদের ভোট করার সিদ্ধান্তও শিগগির আসতে পারে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, জোট সম্প্রসারণে গণতন্ত্র মঞ্চের কয়েকটি দলের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কিছু দলের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ইতোমধ্যে সমন্বিত প্রার্থী বাছাই, যৌথ রাজনৈতিক ইশতেহার, ব্র্যান্ডিং ও প্রচার কৌশল নির্ধারণে দুটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সম্প্রতি জোট নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে পরিস্থিতি এখনো পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের এক নেতা জানান, জোটে আরও একাধিক দল যুক্ত হওয়ার আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ইতোমধ্যে এনসিপি প্রথম ধাপে ১২৫ আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৪০–৫০ আসনের প্রার্থী তালিকাও প্রায় চূড়ান্ত, যা শিগগির প্রকাশ করা হবে। এবি পার্টি আগেই ১০৯ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। গণতন্ত্র মঞ্চ থেকেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে—যেখানে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রায় ৩০ জন প্রার্থী রয়েছেন। নতুন জোটে এ সংখ্যা বেড়ে ৪০–৫০ হতে পারে। এসব প্রার্থীকে সমন্বয় করে ৩০০ আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
