আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস–২০২৬। এ বছরের প্রতিপাদ্য— “খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ সবল জীবন গড়ি”। ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো এ দিবস পালন শুরু হয়।
দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয়—এসব বিষয়ে সর্বস্তরে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাও এ দিবসের উদ্দেশ্য।
তবে বাস্তবে দেশের মানুষ কতটা নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছে—তা নিয়ে জনমনে রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। বিএফএসএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জাকারিয়া স্বীকার করেছেন, বর্তমানে খাবারে ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তিনি আমার দেশ–কে বলেন, “এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। অনেক প্রতিষ্ঠান এতে জড়িত।
একদিনে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে মনিটরিং ও জনসচেতনতার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে উৎপাদক, বিক্রেতা ও ভোক্তা—সবারই সচেতন হওয়া জরুরি।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দেশে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট।
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আফজালুর রহমান বলেন, ট্রান্সফ্যাট রক্তের ভালো কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয় এবং খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ায়। চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, দেশে অসংক্রামক রোগে যত মানুষ মারা যায়, তার প্রায় অর্ধেকই মারা যায় হৃদরোগে—সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিমেল সাহা বলেন, দেশে হৃদরোগ বৃদ্ধির পেছনে ট্রান্সফ্যাট বড় ভূমিকা রাখছে। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের জানান, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও)—যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। বেকারি পণ্য, ভাজাপোড়া খাবার এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে এসব তেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
পুষ্টিবিদরা বলছেন, ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড একটি বিষাক্ত খাদ্য উপাদান, যা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ট্রান্সফ্যাটমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে বিএফএসএ সব ধরনের তেল ও খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রবিধানমালা জারি করেছে।
এদিকে ফাস্টফুডের নামে মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে আরেক ধরনের ‘নীরব বিষ’। খাবারের স্বাদ বাড়াতে অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে টেস্টিং সল্ট (এমএসজি)। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত এমএসজি গ্রহণে কিডনি বিকলসহ জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির সমীক্ষায় বাজারে প্রচলিত আলুর চিপস, নুডুলস, পপকর্ন ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে অতিমাত্রায় টেস্টিং সল্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পুষ্টিবিদরা বলছেন, টমেটো ও পনিরে প্রাকৃতিকভাবে এমএসজি থাকায় কৃত্রিম টেস্টিং সল্টের বদলে এসব উপাদান ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাট হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী অসংক্রামক রোগের অন্যতম কারণ। এসব উপাদানের লাগামহীন ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, “আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি খাবারের নামে বিষ কিনে খাচ্ছি? নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।”
এদিকে সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মোড়কজাত খাদ্যে স্বাস্থ্য সতর্কতা নেই। বরং আকর্ষণীয় শব্দ ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী জানান, মোড়কজাত খাদ্যে চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটের তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, আইনের প্রয়োগ ও লেবেলিং কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান—জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া খাদ্যের নামে মানুষকে ‘বিষ’ খাওয়ানো বন্ধ করা সম্ভব নয়।







