আরবি ‘জাকাত’ শব্দের মধ্যে দুটি মৌলিক অর্থ নিহিত রয়েছে। একটি হলো—ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া, আরেকটি হলো—শুদ্ধ ও পবিত্র হওয়া। আরবি ভাষাবিদদের মতে, যে জিনিস বৃদ্ধি পায় তা স্বভাবতই পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র থাকে। আরবিতে বলা হয়—“জাকা জরউ ইয়াজকু জাকাহ”, অর্থাৎ ফসল যেমন বেড়ে ওঠে, তেমনি জাকাতও বরকত বাড়ায়। কৃষিক্ষেত্রে ফসল তখনই ভালোভাবে বৃদ্ধি পায়, যখন তা আবর্জনামুক্ত ও পরিচ্ছন্ন থাকে। এ কারণেই জাকাত শব্দটি বৃদ্ধি, পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতার অর্থ বহন করে।
শরিয়তের পরিভাষায়, ব্যক্তির সম্পদের ওপর আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরজ অংশ নির্দিষ্ট হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে জাকাত বলা হয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, সম্পদ থেকে আল্লাহ নির্ধারিত অংশ বের করে দেওয়াকে জাকাত বলা হয়, কারণ এর মাধ্যমে সম্পদে বরকত বৃদ্ধি পায় এবং জাকাতদাতা নানা বিপদ-আপদ থেকে পবিত্র থাকেন।
সুফি সাধকেরা মনে করেন, জাকাত মানুষকে দুই ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা করে—প্রথমত আখেরাতের জবাবদিহি থেকে এবং দ্বিতীয়ত দুনিয়ার বালা-মুসিবত থেকে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জাকাত মানুষের আত্মা ও সম্পদকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে। এক ইসলামি স্কলারের ভাষায়, জাকাতের মাধ্যমে মানুষ দুই ধরনের পবিত্রতা অর্জন করে—একদিকে তার সম্পদ পবিত্র হয়, অন্যদিকে তার মন-মানসিকতা কৃপণতা, স্বার্থপরতা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়।
এ বিষয়ে ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, জাকাত প্রদানের ফলে দাতার আত্মা পবিত্র হয় এবং এর প্রভাবে আল্লাহ তার সম্পদে বরকত দান করেন, ফলে তা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। ইসলামি চিন্তাবিদ ইউসুফ আল-কারজাভির মতে, এই বৃদ্ধি শুধু সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের চিন্তা, মনন ও মানসিকতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে জাকাতদাতা ধীরে ধীরে উন্নত চরিত্র ও রুচির অধিকারী হয়ে ওঠেন।
ইমাম নববী ‘আল-হাভি’ গ্রন্থের লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ‘জাকাত’ শব্দটি ইসলামি শরিয়ত প্রবর্তনের আগেও আরবি ভাষায় পরিচিত ছিল এবং জাহেলি যুগের কবিতা ও সাহিত্যেও এর ব্যবহার পাওয়া যায়। তবে ইমাম দাউদ জাহেরি এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ইসলামের আগে ‘জাকাত’ শব্দের প্রচলন ছিল না। (ফিকহুজ জাকাত)
জাকাতের আরেক নাম সদকাহ। পবিত্র কোরআনে অনেক স্থানে জাকাতের প্রতিশব্দ হিসেবে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন জাকাতের খাত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—“সদকাহ তো মূলত ফকির, মিসকিন, সদকার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করা প্রয়োজন, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্তদের সহায়তা, আল্লাহর পথে ব্যয় এবং মুসাফিরদের জন্য নির্ধারিত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।” (সুরা তাওবা : ৬০)
জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। জাকাতদাতা হতে হবে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান। যদি তার মালিকানায় নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং তা পূর্ণ এক বছর ধরে তার কাছে থাকে, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়। (রদ্দুল মুহতার : ২/২৫৯)
জাকাতের নিসাব স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিশ মিসকাল, যা আধুনিক হিসাবে প্রায় সাড়ে সাত ভরি। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৭৭–৭০৮২) আর রুপার ক্ষেত্রে নিসাব ২০০ দিরহাম, যা প্রায় সাড়ে ৫২ তোলা। (বুখারি : ১৪৪৭; মুসলিম : ৯৭৯) এ পরিমাণ সোনা বা রুপা থাকলে জাকাত দেওয়া ফরজ। একইভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নগদ অর্থ বা বাণিজ্যদ্রব্যের মূল্য যদি সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের সমপরিমাণ হয়, তাহলে জাকাতের নিসাব পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং তার ওপর জাকাত দিতে হবে।
যদি সোনা, রুপা, নগদ অর্থ বা বাণিজ্যদ্রব্য পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না হলেও একাধিক সম্পদ একত্র করলে তার মূল্য সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের সমপরিমাণ বা তার বেশি হয়, তাহলে সেগুলো একত্রে হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৬৬, ৭০৮১)
অর্থাৎ কারো কাছে কিছু স্বর্ণালংকার, কিছু উদ্বৃত্ত অর্থ কিংবা বাণিজ্যদ্রব্য থাকলে এবং সেগুলো একত্র করলে নিসাব পূর্ণ হয়, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। এমনকি কারো কাছে নিসাবের কম রুপা থাকলেও তার সঙ্গে যদি নগদ অর্থ বা বাণিজ্যদ্রব্য যুক্ত হয়ে মোট সম্পদের মূল্য নিসাবের সমপরিমাণ হয়, তাহলেও জাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। (রদ্দুল মুহতার : ২/৩০৩)
লেখক : পীর সাহেব, আউলিয়ানগর
