জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের পর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এ প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
বিইআরসি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার কমিশনের সভায় পিডিবির প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। একইসঙ্গে পাইকারি দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুচরা পর্যায়েও আনুপাতিক হারে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন পাইকারি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ৮ টাকা ৯৫ পয়সা, আর পাইকারি দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, পাইকারি দামের পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে খুচরা পর্যায়ের মূল্য সমন্বয় করা হয়। এ কারণে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব যাচাই করতে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে পাঁচটি বিতরণ সংস্থার মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে, বাকিগুলোর প্রস্তাবও শিগগির জমা পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমিশনের বিধি অনুযায়ী, কারিগরি কমিটি সব প্রস্তাব মূল্যায়ন করবে। পরে অংশীজনদের নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করা হবে। সেখানে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই শেষে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। বিদ্যুৎ খাতের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি এবং সরকারের ভর্তুকি বিবেচনায় নিয়ে দাম বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে পিডিবি তা ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে কম দামে সরবরাহ করে থাকে। এ কারণে সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে সরকার থেকে ভর্তুকি নিতে হয় পিডিবিকে। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি ছাড়াই খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা করছে।
বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে পিডিবি। বছরে প্রায় ৯ হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সংস্থাটি। সে হিসাবে দেড় টাকা বাড়লে বছরে অতিরিক্ত সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা আয় হতে পারে। আর ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়লে বাড়তি আয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
পাইকারি মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব খুচরা পর্যায়েও পড়বে। হিসাব অনুযায়ী, গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দিয়েছে। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা সঞ্চালন চার্জ বাড়ানোর আবেদন করেছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের ৬৩ শতাংশই স্বল্প ব্যবহারকারী, যারা মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এ শ্রেণির গ্রাহকদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ না দিয়ে বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি দাম আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ এপ্রিল নির্বাহী আদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। পরে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের জন্য ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়।
গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ সরকার পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার খরচ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং দাম নির্ধারণের ক্ষমতা আবার বিইআরসির হাতে ফিরিয়ে দেয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমানো গেলেও তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি ৫৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ঘাটতির অজুহাতে বারবার মূল্যবৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়। তাঁর মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত খরচ রয়েছে, যা কমানো গেলে ভর্তুকির চাপও কমে আসবে। অন্যথায় আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের নীতিগত কোনো পার্থক্য থাকবে না।







