স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এবার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিএনপি। কারণ আসন্ন নির্বাচনে থাকছে না দলীয় প্রতীক। একই সঙ্গে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় জয় নিশ্চিত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কঠোর বার্তা দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে জনসমর্থন ও ভোটারদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমেই বিএনপিকে নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকতে হবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, সমন্বয়ের মাধ্যমে একক প্রার্থী নির্ধারণ এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর তুলনামূলক ‘ক্লিন ইমেজ’সম্পন্ন স্থানীয় প্রভাবশালীরাও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বিএনপি।
এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনি তৎপরতা শুরু করেছেন। পাশাপাশি এনসিপিও রোববার ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় তাদের দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এমন বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন বিএনপি কীভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দল প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তফসিল ঘোষণার পর দল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। এ ক্ষেত্রে দলের প্রতি ত্যাগ, সাংগঠনিক ভূমিকা ও ব্যক্তিগত ইমেজকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তারা।
তাদের ভাষ্য, বিএনপি দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কিছু এলাকায় কোন্দল থাকলেও তা দ্রুত সমাধানে কেন্দ্র থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী তত বাড়বে। তার মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সরকারের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। গত শনিবার বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রশাসনিক প্রভাব বা বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে কাউকে নির্বাচিত করা হবে না।
প্রধানমন্ত্রী নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করেই প্রার্থীদের নির্বাচিত হতে হবে। যারা ভোটারদের মন জয় করতে পারবেন, তারাই বিজয়ী হবেন।
দলের নেতারা মনে করছেন, এ বার্তা যেমন তৃণমূলের জন্য সতর্ক সংকেত, তেমনি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণের বড় চ্যালেঞ্জও। দীর্ঘ দেড় দশক পর একটি তুলনামূলক নিরপেক্ষ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে বিএনপি।
বিগত সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও নির্বাচনের আগে দলীয় ঐক্য কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিএনপির অর্ধশতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, যার ফলে কয়েকটি আসনে ক্ষতির মুখে পড়ে দলটি।
দলীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রতীক না থাকায় একাধিক যোগ্য প্রার্থীর মাঠে নামার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় তৃণমূলের বিরোধ মিটিয়ে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ। প্রভাবশালী নেতারা কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করলে ভোট বিভক্তির সুযোগ নিতে পারে প্রতিপক্ষ।
এ ছাড়া প্রশাসনিক সহায়তা ছাড়া নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও অনেক নেতার মধ্যে এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামায়াত ও এনসিপি ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রার্থী ঘোষণা শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও জামায়াত প্রায় এক বছর আগেই একক প্রার্থী নির্ধারণ করে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়েছিল, যা বিএনপির জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছিল।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কোনো চ্যালেঞ্জ দেখছে না। তার ভাষায়, “মূল বিষয় হলো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া। সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। কে জিতল বা হারল, সেটি মুখ্য নয়।”
তিনি আরও বলেন, অতীতে শেখ হাসিনা সরকার জোরপূর্বক নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করত। এবার সেই পরিস্থিতি থাকবে না এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
দলটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল জানান, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছেন। কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা এলেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা তা মেনে নেবেন।
ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, দীর্ঘদিন পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নেতাকর্মীদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তার মতে, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী একক প্রার্থী নির্ধারণ করা সম্ভব হবে এবং জনগণের আস্থা অর্জনে বিএনপি সফল হবে।
তবে মাঠপর্যায়ের কয়েকজন নেতা মনে করছেন, জামায়াতের আগাম প্রস্তুতি বিএনপিকে কিছুটা চাপে ফেলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তৃণমূল নেতা বলেন, জামায়াত অনেক আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠে কাজ শুরু করেছে। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী নির্ধারণে বিলম্ব হওয়ায় কর্মীদের মধ্যে কিছুটা ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। তবে ঐক্য বজায় রাখতে পারলে জয় সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় রাজনীতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমীকরণ এক নয়। দলীয় প্রতীক না থাকায় ভোটারদের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক ইমেজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই বাস্তবতায় স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।







