বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি শোনা যায়, সেটি হলো—“রাজস্ব ঘাটতি”। সেই ঘাটতি পূরণ করতে সরকার একের পর এক নতুন কর আরোপ করছে, পুরোনো করের হার বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেলের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের আলোচনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি রাষ্ট্র কতদিন শুধু জনগণের পকেটের দিকে তাকিয়ে অর্থনীতি চালাবে? রাষ্ট্র কি কেবল ট্যাক্স আদায়ের যন্ত্র, নাকি উৎপাদন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও দায়িত্ব তার রয়েছে?
অর্থনীতিকে যদি একটি বাগানের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে ট্যাক্স হলো সেই বাগানের ফল। কিন্তু ফল পেতে হলে আগে গাছ লাগাতে হয়, পরিচর্যা করতে হয়, পানি দিতে হয়। আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে—আমরা ফল তুলতে ব্যস্ত, কিন্তু নতুন গাছ লাগানোর উদ্যোগ তুলনামূলক কম। শিল্পায়ন, উৎপাদন ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া শুধু কর বাড়িয়ে কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারেনি।
একজন জেলের গল্প ধরা যাক। তার একটি ছোট পুকুরে কিছু মাছ আছে। এখন যদি সে প্রতিদিন শুধু মাছ ধরতেই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু নতুন পোনা না ছাড়ে, খাবার না দেয়, পুকুরের যত্ন না নেয়—তাহলে কিছুদিন পর পুকুর খালি হয়ে যাবে। তখন তার আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের অর্থনীতিও অনেকটা এমন। জনগণের আয় বাড়ানো, শিল্প গড়ে তোলা ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ ছাড়া শুধু কর আদায় বাড়াতে থাকলে একসময় অর্থনীতির ভেতরের শক্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজকের বাস্তবতায় মোটরসাইকেল আর বিলাসপণ্য নয়। এটি বহু মানুষের জীবিকা ও প্রয়োজনের অংশ। কেউ অফিসে যেতে ব্যবহার করেন, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা চালান, আবার কেউ রাইড শেয়ারিং করে সংসার চালান। এই খাতে অতিরিক্ত কর আরোপ মানে শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ানো নয়; বরং বহু মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ও জীবিকার উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা।
এখানেই আসে “টেকসই উন্নয়ন” বা Sustainable Development-এর প্রশ্ন। টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু সাময়িকভাবে রাজস্ব বাড়ানো নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও জনগণ—উভয়ের জন্য স্থিতিশীল সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোয়, যখন সেখানে শিল্প গড়ে ওঠে, উৎপাদন বাড়ে, প্রযুক্তি উন্নত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর—তারা কেউই শুধু কর বাড়িয়ে সমৃদ্ধ হয়নি। তারা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় শিল্পায়ন করেছে, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। ফলে জনগণের আয় বেড়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, এবং স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের রাজস্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশেও একসময় রাষ্ট্রীয় পাটকল, চিনিকল, টেক্সটাইল মিলসহ নানা শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। দুঃখজনকভাবে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক অদক্ষতার কারণে সেগুলোর অনেকগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্রীয় শিল্পায়নের কথা কি ভাবা যায় না? সরকার চাইলে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কিংবা যানবাহন উৎপাদন খাতে বড় বিনিয়োগ করতে পারে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং রাষ্ট্রের আয়ও দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা অনেক সময় সহজ পথটাই বেছে নিই। নতুন কর বসানো সহজ; কিন্তু শিল্প গড়ে তোলা কঠিন। কারণ শিল্প গড়তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লাগে, দক্ষ নেতৃত্ব লাগে, স্বচ্ছতা লাগে এবং রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা লাগে। অথচ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় সে কত কর আদায় করল তা দিয়ে নয়; বরং সে কত মানুষকে কাজের সুযোগ দিল, কত নতুন উৎপাদন তৈরি করল এবং কতটা আত্মনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলল—তা দিয়ে।
রাষ্ট্রের কাজ শুধু জনগণের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ আয় করতে পারবে, উদ্যোক্তা তৈরি হবে, উৎপাদন বাড়বে। মানুষ যখন আয় করবে, ব্যবসা বাড়বে, শিল্প বাড়বে—তখন রাষ্ট্রের রাজস্বও স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। এটাই টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি।
কারণ বাস্তবতা খুব সহজ—পুকুরে নতুন মাছ না ছেড়ে শুধু মাছ ধরতে থাকলে একসময় পুকুর খালি হয়ে যায়। ঠিক তেমনি উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধু কর বাড়াতে থাকলে অর্থনীতির ভেতরের শক্তিও একসময় ফুরিয়ে যেতে শুরু করে।
লেখক: ব্লগার ও কলামিস্ট







