বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগে টিকিট জালিয়াতি এবং দুর্নীতির দায়ে একসময় চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা আশরাফুল আলম এখন সংস্থাটির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পদ ‘পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস)’ হিসেবে বহাল তবীয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। বিমানের টিকিট সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির সাথে দুই দশক ধরে যুক্ত থাকার গুরুতর প্রমাণ মেলার পরও অলৌকিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিটি শাস্তির পরই তিনি আরও ক্ষমতাধর হয়ে ফিরে এসেছেন।
শিক্ষানবিশ কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৯৮ সালে বিমানে যোগ দেওয়া আশরাফুল আলমের মূল উত্থান শুরু হয় ২০০২ সালের পর থেকে। পরবর্তীতে ২০১০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কুয়েত ও নিউইয়র্ক স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে টিকিট ইস্যু, স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সির সাথে অবৈধ আঁতাত এবং আয়ের হিসাবে কোটি কোটি টাকার অসংগতির গুরুতর প্রমাণ মেলে বিমানের অভ্যন্তরীণ অডিট ও তদন্তে।
২০১৭ সালে দেশে ফিরে আশরাফুল আলম বিমানের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা কার্যত সীমিত করে ম্যানুয়াল বুকিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেন। সে সময় তিনি একই সাথে পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন), মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) ও মহাব্যবস্থাপক (জেলা বিক্রয়)—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ কুক্ষিগত করে মধ্যপ্রাচ্যের রুটে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। আসন খালি রেখে ফ্লাইট চালানো এবং গ্রুপ বুকিংয়ের মাধ্যমে টিকিট ব্লক করে দাম আকাশচুম্বী করার অভিযোগে ২০১৯ সালে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিমান বোর্ড তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে ওএসডি করে এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
চাকরিচ্যুত হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ২০২১ সালের গোড়ার দিকে বিমানের তৎকালীন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সালেহ মোস্তফা কামাল দায়িত্ব নিয়েই এক রহস্যজনক আদেশে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত আশরাফুল আলমকে কেবল ‘মৃদু ভর্ৎসনা’ করে চাকরিতে পুনর্বহাল করেন। পুনর্বাহালের পর জেদ্দা ও মদিনা রুটের টিকিটের দাম ৭০ হাজার থেকে এক লাফে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় পৌঁছায় এবং ২২ শ’ টিকিট লক করে প্রবাসীদের পকেট কাটার নতুন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের ফ্রি টিকিটসহ নানা অনৈতিক সুবিধা দিয়ে নিজের খুঁটির জোর বজায় রাখতেন তিনি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও আশরাফুল আলমের ক্ষমতা কমেনি, বরং বেড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, গত ১৪ আগস্ট বিমানে বড় রদবদলের অংশ হিসেবে জেনারেল ম্যানেজার পদে থাকা এই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে সরাসরি ‘পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস)’ পদে পূর্ণ পদোন্নতি দেওয়া হয়। দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে আশরাফুল আলম সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে সেগুলোকে ‘ভুল তথ্য’ এবং বিষয়টির ‘সমাধান হয়ে গেছে’ বলে দাবি করেন।
এদিকে বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের আরেক বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রশীদকে গত সোমবার ‘নির্বাহী পরিচালক’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হলেও দুর্নীতির অভিযোগে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা বাতিল করা হয়। সরকারি অর্থে সফটওয়্যার কেনায় প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।







