হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম এবং আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ। প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসলমান পবিত্র মক্কায় সমবেত হন এই ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে।
ইসলামি পরিভাষায় হজের অর্থ হলো নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত স্থানে বিশেষ কিছু আমল সম্পাদন করা। তবে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন কারও ওপর হজ ফরজ হলেও শারীরিক অক্ষমতা, বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে হজে যেতে পারেন না। এমন অবস্থায় ইসলামে তার পক্ষ থেকে অন্য কাউকে দিয়ে হজ করানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, যাকে বলা হয় ‘বদলি হজ’।
ইসলাম বিষয়ক লেখক ও গবেষক শরীফ মোহাম্মদ বলেন, যে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা নেই এবং ভবিষ্যতেও সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই, তার ক্ষেত্রেই বদলি হজের বিধান প্রযোজ্য হয়। তবে কেউ যদি নিজে হজ পালনে সক্ষম হন, তাহলে তার জন্য বদলি হজ গ্রহণযোগ্য হবে না।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, বদলি হজ পালনের ক্ষেত্রেও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। যিনি অন্যের পক্ষ থেকে হজ পালন করবেন, তাকেও ইসলামের বিধান মেনে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বদলি হজ কী
যে ব্যক্তি নিজের ওপর ফরজ হওয়া হজ শারীরিক অক্ষমতার কারণে আদায় করতে পারেন না, তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ হজ পালন করলে সেটিকে বদলি হজ বলা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ওই ব্যক্তির ওপর থাকা ফরজ দায়িত্ব আদায় করা।
আনিসুজ্জামান শিকদার বলেন, কেউ মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে গেলে কিংবা জীবিত অবস্থায় বুঝতে পারেন যে তিনি আর হজে যেতে পারবেন না, তখন তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ হজ পালন করতে পারেন।
ইসলামি গবেষকদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হওয়ার পরও তিনি অবহেলায় হজ না করেন এবং পরে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন, তাহলে তার পক্ষ থেকে অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ করানো ফরজ হয়ে যায়।
আবার কেউ হজ পালনের আগেই মৃত্যুবরণ করলে, তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে উত্তরাধিকারীরা বদলি হজ করাতে পারেন। মৃত্যুর আগে যদি তিনি এ বিষয়ে ওসিয়ত করে যান, তাহলে তা বাস্তবায়ন করা ওয়াজিব বলে বিবেচিত হয়।
যেসব অবস্থায় বদলি হজ করা যায়
ইসলামি বিধান অনুযায়ী কয়েকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বদলি হজ করানো বৈধ। যেমন—
দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা শারীরিক অক্ষমতা
বার্ধক্যজনিত কারণে হজে যেতে অসমর্থ হওয়া
জোরপূর্বক আটকে রাখা বা বন্দি থাকা
সফরের পথ অনিরাপদ হওয়া
নারীর ক্ষেত্রে মাহরাম সঙ্গী না পাওয়া
তবে কেউ যদি সাময়িক অসুস্থ থাকেন এবং ভবিষ্যতে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে অপেক্ষা করতে হবে এবং নিজেই হজ আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
শরীফ মোহাম্মদ বলেন, অনেক সময় এমন হয় যে একজন ব্যক্তি আর্থিকভাবে সক্ষম হলেও শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েন যে তার পক্ষে হজে যাওয়া সম্ভব হয় না। এমন অবস্থায় বদলি হজ করানো বৈধ।
তবে জীবিত অবস্থায় বদলি হজ করানোর পর যদি ব্যক্তি আবার সুস্থ হয়ে যান বা সংকট কেটে যায়, তাহলে পূর্বের বদলি হজ যথেষ্ট হবে না; তাকে নিজেকেই ফরজ হজ আদায় করতে হবে।
বদলি হজের খরচ ও বিধান
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, যার পক্ষ থেকে বদলি হজ করানো হবে, খরচও তাকেই বহন করতে হবে। তিনি মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে গেলে তার সম্পদ থেকেই এই ব্যয় বহন করা হবে।
ধর্মীয় গবেষকদের মতে, বদলি হজ করানোর ক্ষেত্রে নিকট আত্মীয়কে দায়িত্ব দেওয়া উত্তম। যদিও অনেকেই আলেম-ওলামাদের মাধ্যমে বদলি হজ করিয়ে থাকেন।
এছাড়া নারী বা পুরুষ—উভয়েই একে অপরের পক্ষ থেকে বদলি হজ করতে পারেন। কোনো নারীর বদলি হজ কেবল নারী দিয়েই করাতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই।
জেলবন্দি বা অবরুদ্ধ ব্যক্তির ক্ষেত্রে
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, যদি কেউ এমন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন যেখানে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং তার ওপর হজ ফরজ হয়ে থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকেও বদলি হজ করানো যেতে পারে।
আনিসুজ্জামান শিকদার বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি আজীবন কারাদণ্ডে থাকেন এবং আর্থিকভাবে সক্ষম হন, তাহলে তিনি অন্য কাউকে দিয়ে নিজের পক্ষ থেকে হজ আদায় করাতে পারবেন।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, বদলি হজের উদ্দেশ্য হলো এমন ব্যক্তির ফরজ দায়িত্ব আদায় করা, যিনি বাস্তব কারণে নিজে হজ পালন করতে অক্ষম। তাই এই বিধান ইসলামে বিশেষ সহজীকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
