ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির আশা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি উল্টো দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে সারা দেশে চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে এই ধরনের সহিংসতা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ১৮১ জন নারী ও শিশু। ডিসেম্বরে কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি থেকে এই সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে নির্যাতনের হার সর্বোচ্চ ২২০ জনে পৌঁছেছে। মে মাসের পরিসংখ্যান এপ্রিলের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও এই চিত্র আরও ভয়াবহ। এপ্রিলে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২ হাজার ১১টিতে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ঢাকার শিল্পাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলো (ঢাকা রেঞ্জ) সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ও রাজশাহী রেঞ্চেও অপরাধের হার ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
ধর্ষণের ঘটনাও গত দুই মাসে আশঙ্কাজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ধর্ষণের গড় হার ৩০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে থাকলেও মার্চে তা ৫৭ এবং এপ্রিলে ৫৮ জনে পৌঁছায়। শুধু এপ্রিলেই ১৭টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি শিশু হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে; আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, বছরের প্রথম চার মাসে ১১৫টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য বিচারহীনতা ও অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রশ্রয়কে দায়ী করছেন। নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, অপরাধের বিচার না হওয়ায় এবং অপরাধীরা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকায় বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পাশাপাশি সামাজিকভাবে গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম মনে করেন, সমাজ এখন অপরাধপ্রবণ ও হিংস্র হয়ে উঠছে। তার মতে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এবং ক্ষমতার দাপটের কারণেই অপরাধীরা সাহসী হয়ে উঠছে। কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজকে অস্থির ও অপরাধপ্রবণ করে তুলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
