যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ সাধারণত সেই দলের নেতা-কর্মী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠদের হাতেই থাকে। কোথাও তাঁরা সরাসরি ইজারাদার হিসেবে থাকেন, আবার কোথাও নেপথ্য থেকে পুরো হাট পরিচালনা করেন। হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের বাইরে অন্য কেউ দরপত্র জমা দেওয়ার সাহসই পান না। যদিও কাগজে-কলমে পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়মতান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে দেখানো হয়।
আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত শাসনামলে রাজধানীর অধিকাংশ অস্থায়ী পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করতেন দলটির নেতা-কর্মীরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ এখন বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠদের হাতে চলে গেছে।
হাট ইজারার ক্ষেত্রে আগে থেকেই সমঝোতার মাধ্যমে ঠিক করে রাখা হতো কে কত দর দেবেন এবং কোন হাট কার দখলে যাবে। আওয়ামী লীগ বা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বাইরে কেউ যাতে দরপত্র জমা দিতে না পারেন, সে ব্যবস্থাও থাকত। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও সেই পুরোনো সংস্কৃতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
এবার রাজধানীতে মোট ২১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১১টি এবং দক্ষিণে ১০টি। উত্তরের প্রায় সব হাটই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। কোথাও তাঁরা সরাসরি ইজারাদার, কোথাও আবার আড়ালে থেকে পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছেন। দক্ষিণের ১০টি হাটের মধ্যে ৮টির ইজারা পেয়েছেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা তাঁদের ঘনিষ্ঠজনেরা। একটি হাট পেয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান এবং আরেকটি হাটের ইজারা গেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর কাছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের মতো এখনও যদি একইভাবে ক্ষমতাসীনদের দখলে হাট ইজারা যায়, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিফলন কোথায়—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। তাঁর মতে, প্রায় সব হাটই ঘুরেফিরে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যে দেখা যায়, কোনো কোনো হাট সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চার গুণ বেশি দামে ইজারা দেওয়া হয়েছে, আবার কোনোটি সরকারি দরের চেয়ে সামান্য বেশি মূল্যে। যেমন ডেমরার আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকার হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা, কিন্তু সেটি ইজারা হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায়। অন্যদিকে সিকদার মেডিকেল কলেজ-সংলগ্ন হাট মাত্র ১০ হাজার টাকা বেশি দামে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন নদীপাড়ের হাট ইজারা পেয়েছেন শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মাওলা। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ আমলে অন্য দলের কারও হাট ইজারা নেওয়ার সুযোগ ছিল না; এবার অন্তত প্রতিযোগিতা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার হাট তিনি ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় নিয়েছেন।
উত্তর শাহজাহানপুর, ডেমরা, মতিঝিল, রহমতগঞ্জ, গোপীবাগ, বনশ্রীসহ দক্ষিণের বেশির ভাগ হাটই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সাবেক কাউন্সিলর বা তাঁদের ঘনিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। একইভাবে উত্তর সিটির দিয়াবাড়ি, পলিটেকনিক এলাকা, বাড্ডা, বড় বেরাইদ, হাজীপাড়া, উত্তরখান, বনরূপা, মিরপুর, কালশী ও খিলক্ষেত এলাকার হাটগুলোর ইজারাও পেয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান অবশ্য দাবি করেছেন, দলীয় বিবেচনায় নয়, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেই হাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সবার জন্য অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছিল এবং সর্বোচ্চ দরদাতাকেই মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। কারণ, প্রায় সব বড় হাটই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে হাট বণ্টনের অভিযোগ ছিল, এখনো অনেকের মতে সেই সংস্কৃতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি; শুধু নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ বদলেছে।
এদিকে রাজধানীর দুটি স্থায়ী পশুর হাট—গাবতলী ও ডেমরার সারুলিয়া—ছাড়াও অস্থায়ী হাটগুলোতে আগামীকাল রোববার থেকে কোরবানির পশু কেনাবেচা শুরু হবে এবং ঈদের দিন পর্যন্ত চলবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাটে পশু আসা শুরু হয়েছে।
পশুর হাট ঘিরে নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জাল নোট শনাক্তকরণ ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সমন্বয় সভা করেছে। হাটগুলোতে সিসি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার, পর্যাপ্ত আলো, ব্যাংকিং সুবিধা ও কন্ট্রোল রুম রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রতি বছরের মতো এবারও আশঙ্কা রয়েছে যে হাটের সীমানা ছাড়িয়ে সড়ক, ফুটপাত ও আবাসিক এলাকায় পশুর বাজার ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে যানজট ও জনভোগান্তি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম জানিয়েছেন, কেউ শর্ত ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জনদুর্ভোগ কমাতে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করবে।







