সর্বনাশা মাদকের বিস্তারে দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, বখাটেপনা এবং খুন-ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ। এর সাম্প্রতিক শিকার রাজধানীর পল্লবীর স্কুলছাত্রী রামিসা। কয়েক বছর আগে সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর অপরাধযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যে আতঙ্কের শুরু, পরে সাভারের নরপিশাচ সম্রাটের মতো অপরাধীরা সেই ভয়াবহতাকে আরও গভীর করে তোলে। এসব অপরাধীর বড় অংশই মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। মাদকের নেশায় তারা মানবিক বোধ হারিয়ে ফেলছে, আচরণে হয়ে উঠছে হিংস্র ও নিষ্ঠুর। ফলে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য পরিবার, বিপর্যস্ত হচ্ছে সামাজিক স্থিতি। যুগান্তরের অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
যদিও প্রতিটি সরকারই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলে এসেছে, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক আশ্রয়ে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের রক্ষা করা হয়েছে, এমনকি কেউ কেউ সংসদ সদস্যও হয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে প্রধান দুটি কারণ হলো—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত সদস্যের সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক গডফাদারদের মদদ। এর প্রভাবে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং ও মাদকাসক্ত তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা কম দেখানো হলেও বেসরকারি হিসাবে তা পাঁচ লাখেরও বেশি। সীমান্তবর্তী অঞ্চল, বিশেষ করে কক্সবাজার ও টেকনাফে এর বিস্তার বেশি। বস্তি থেকে উচ্চবিত্ত এলাকা, এমনকি স্কুল, কলেজ ও নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যাওয়া, সামাজিক বন্ধনের অবক্ষয় এবং তরুণদের মোবাইলনির্ভর জীবনধারা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তার ভাষ্য, অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন কনটেন্ট তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক প্রবণতা বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মাদক উৎপাদিত হয় না; সবই চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। তাই এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিক ব্যাধি হিসেবেও মোকাবিলা করতে হবে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং পুলিশের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ার সুযোগে সারা দেশে মাদকের বড় বড় চালান ছড়িয়ে পড়ে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ থেকে ইয়াবা ও আইসের শত শত চালান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা মাদক গডফাদাররা নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
মাদকাসক্তিকে ঘিরে দেশে একের পর এক অপরাধও ঘটছে। সম্প্রতি বগুড়ায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া তিনজনই মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, সিলেট ও সাভারেও মাদকসংশ্লিষ্ট সহিংসতায় খুন ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এলএসডিতে আসক্ত এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় মাদকসেবী মজনু মিয়ার গ্রেফতার দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে মাদক হাতের নাগালেই পাওয়া যাচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপেও ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রি হচ্ছে। হোম ডেলিভারির মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক ও হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন খোলা স্থান মাদকের আড্ডাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মাদক ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন নামকরা ইংরেজিমাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও। নারকোটিক্স বিভাগ ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে ডোপ টেস্ট চালু করেছে।
শুধু নিম্নবিত্ত নয়, উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও মাদকের বিস্তার ঘটেছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান, রাজনৈতিক ব্যক্তি, এমনকি শোবিজ অঙ্গনের পরিচিত মুখদের বিরুদ্ধেও মাদকসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে কার্যকর অভিযান চালানোর পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
এদিকে ইয়াবা, হেরোইন ও আইসের পাশাপাশি দেশে নতুন নতুন মাদকের বিস্তারও বাড়ছে। এমডিএমএ, কিটামিন, টিএইচসি, কুশ, এলএসডি ও ডিওবির মতো ভয়ংকর মাদক এখন সহজলভ্য হয়ে উঠছে। নারকোটিক্স কর্মকর্তারা সম্প্রতি ‘জম্বি’ নামে নতুন এক ধরনের মাদকের অস্তিত্ব পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন, যা গ্রহণের পর ব্যবহারকারী প্রায় অচেতন ও অচল অবস্থায় চলে যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (গোয়েন্দা) মেহেদী হাসান বলেন, আগে বাংলাদেশ কেবল আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট ছিল। কিন্তু এখন দেশেই কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিছু বিদেশি চক্র রাজধানীকেন্দ্রিক নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।







