আজ (২৫ মে) বাংলা সাহিত্যের অনন্য বাতিঘর ও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী এই মহান সাহিত্যিক ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কালজয়ী এই কবির জন্মদিনটি স্মরণে দেশজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।
কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন মূলত এক বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী মানুষ। তিনি একাধারে যেমন কবি ছিলেন, তেমনি ছিলেন কালজয়ী গীতিকার, সুরকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও নির্ভীক সাংবাদিক। তাঁর সমগ্র লেখনীতে তৎকালীন সমাজের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং মানুষের সামগ্রিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনো মাথা নত না করার এক অনন্য সাহস তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে সমধিক পরিচিত, কারণ তাঁর লেখনী ছিল অত্যন্ত সাহসী, প্রতিবাদী এবং যুগান্তকারী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক চরম বৈষম্য ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে তিনি আজীবন অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কবিতা ও গান সাধারণ মুক্তিকামী মানুষের মনে স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে তৎকালীন তরুণ সমাজ তাঁর রচনার মাঝেই খুঁজে পেয়েছিল প্রতিবাদের আসল ভাষা ও আত্মমর্যাদার অমর বাণী।
নজরুলের বিশাল সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান এবং শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্যের চেতনা। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষ সমান। তাঁর রচনায় ইসলামী ঐতিহ্যের পাশাপাশি হিন্দু সংস্কৃতিরও এক গভীর ও চমৎকার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনি চিরকাল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা প্রচার করেছেন এবং যেকোনো ধরনের ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে কলম ধরে সোচ্চার ছিলেন।
নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল এক চরম সংগ্রামময় আখ্যান। শৈশবে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাবরণ এবং জীবনের শেষভাগে এসে দীর্ঘ ও রহস্যময় অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে থামাতে পারেনি। মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদার পক্ষে তিনি আজীবন লড়ে গেছেন। জন্মের ১২৭ বছর পরও তাঁর দ্রোহ, প্রেম, মানবতা ও সাম্যের বাণী আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।
