বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এবার শিশুদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৮০ সাল থেকে শুরু হওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে বছর দেশে হামের রোগী ছিল ১১ হাজার ৭৭ জন। ১৯৮৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৩২৭ জনে। মাঝে সংক্রমণ কিছুটা কমলেও ২০০৫ সালে তা আবার ২৫ হাজার ৯৩৪ জনে পৌঁছায়। তবে সর্বশেষ ২০২৬ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণের এক ভয়ানক রেকর্ড।
চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, হামের এই ভয়াবহ রূপ রোধ করতে টিকার কোনো বিকল্প নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশে বর্তমানে হাম-রুবেলা টিকার বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চলছে, যেখানে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ইতিমধ্যেই পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতিদিন নতুন করে এক হাজারের বেশি মানুষ হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুর খবর আসছে প্রতিনিয়ত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, এখনো গ্রামে ২০ শতাংশের বেশি এবং শহরাঞ্চলে ৩০ শতাংশের বেশি শিশু টিকাদানের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চলমান রাখা জরুরি।
গেল বছর ইউনিসেফ বাংলাদেশকে কত টিকা সরবরাহ করেছে, তা জানতে ইউনিসেফের সরবরাহ বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। যেখানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ইউনিসেফ নিয়মিত টিকাদানের জন্য হাম-রুবেলার টিকা চার মাসে সরবরাহ করে ৬২ লাখ ১৭ হাজার ডোজ। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সরবরাহ করা হয় ১৭ লাখ ২৫ হাজার ডোজ, সেপ্টেম্বরে আসে ১৮ লাখ ৮০ হাজার ডোজ, অক্টোবরে আসে ২৪ লাখ ৯২ হাজার ডোজ আর নভেম্বরে সরবরাহ করা হয় ১ লাখ ২০ হাজার ডোজ টিকা।
২০২৪ সালে চার মাসে মোট ৫৩ লাখ ১৯ হাজার ডোজ সরবরাহ করা হয়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ লাখ ডোজ কম। অর্থাৎ এক বছরেই সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি মাসে আসে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ ডোজ, সেপ্টেম্বরে আসে ২৫ লাখ ডোজ, অক্টোবরে আসে ১৩ লাখ আর নভেম্বরে আসে ১৩ লাখ ৪ হাজার ৫০০ ডোজ টিকা।
২০২৫ সালে ৮ মাসে ইউনিসেফ টিকা সরবরাহ করে ২ কোটি ৪৯ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ ডোজ। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সম্পূরক টিকাদানের জন্য সরবরাহ করা হয় ৭০ লাখ ডোজ টিকা। সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার ডোজ টিকা সরবরাহ করে ইউনিসেফ, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরবরাহ করা হয় ৩০ লাখ ডোজ, মার্চে ১৫ লাখ ডোজ, এপ্রিলে ৬ লাখ ৫০ হাজার ডোজ, জুনে ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডোজ, আগস্টে ১৩ লাখ ১৩ হাজার ডোজ, সেপ্টেম্বরে সরবরাহ হয় ৮ লাখ ৩৭ হাজার ডোজ, অক্টোবরে ৭০ লাখ ডোজ, নভেম্বরে সরবরাহ হয় ৭৩ লাখ ৯১ হাজার ডোজ। সম্পূরক টিকাদানের জন্য সরবরাহ করা হয় ৭০ লাখ ডোজ টিকা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত দুই বছর কর্মী সংকটসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টিকা কেনার নিয়মটি পরিবর্তনের জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সরকার নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এখন থেকে আর উন্মুক্ত পদ্ধতিতে নয়, বরং দেশের মানুষের সুরক্ষায় আগের মতো সরাসরি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সব টিকা কেনা হবে।







