চট্টগ্রামের প্রবেশমুখ সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে নতুন করে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ মে দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘ইয়াসিন বাহিনী’র সশস্ত্র সদস্যরা সেখানকার র্যাব ক্যাম্পে আকস্মিক হামলা চালায়। র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানান, সন্ত্রাসীরা হঠাৎ করে র্যাব ক্যাম্প ঘিরে ফেলে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। এ সময় আত্মরক্ষার্থে র্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালালে দুপক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়।
র্যাব ক্যাম্পে হামলার প্রায় একই সময়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় অবস্থিত পুলিশ ক্যাম্পেও একযোগে হামলা চালায় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পে এই জোড়া হামলার ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে জঙ্গল সলিমপুরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পুরো দুর্গম পাহাড় জুড়ে যৌথবাহিনীর একটি বড় ধরনের চিরুনি অভিযান চলছে।
চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ৩ হাজার ১০০ একর বিস্তৃত এই জঙ্গল সলিমপুর মূলত এক দুর্গম পাহাড়ি জনপদ। এখানে অন্তত ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষের বসবাস। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটির দুই পাশে উঁচু পাহাড় এবং মাঝখানে অত্যন্ত সরু রাস্তা থাকায় এটি দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দুর্গম পথের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলেও সেখানে সহজে কোনো তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে পারে না।
জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ভয়াবহ গোলাগুলি ও খুনোখুনির মতো ঘটনা ঘটে থাকে। গত ১৯ জানুয়ারি এই এলাকাতেই সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলায় র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মতালেব হোসেন নিহত হন, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। এরপর অপরাধীদের দমনে গত ৯ মার্চ ভোর থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির প্রায় চার হাজার সদস্যের একটি বিশাল যৌথ অভিযান শুরু হয়। সেই অভিযানে ড্রোন এবং হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এরপরই সেখানে র্যাব ও পুলিশের এই স্থায়ী ক্যাম্প দুটি স্থাপন করা হয়।
যৌথ অভিযানের আগ পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরের পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করত ‘ইয়াসিন গ্রুপ’। এর বাইরে সেখানে রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ নামে আরও দুটি অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট বাণিজ্য করা, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং বড় ধরনের মাদক ব্যবসার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালেও জঙ্গল সলিমপুরে র্যাবের সাথে সন্ত্রাসীদের বড় ধরনের গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল। ওই বছরই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করতে গেলে আলীনগরের সন্ত্রাসীরা পুলিশ ও উচ্ছেদকারী দলের ওপর বর্বর হামলা চালায়। পরবর্তীতে সরকার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের নতুন শাখা, মডেল মসজিদ, স্পোর্টস ভিলেজ ও নভোথিয়েটারসহ একাধিক মেগা প্রশাসনিক প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সন্ত্রাসীদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও বাধার কারণে আজ পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর কাজ আলোর মুখ দেখেনি।
