ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং উসকানিমূলক মন্তব্য করার গুরুতর অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শিলিগুড়িতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ২০ মে (বুধবার) শিলিগুড়ি সাইবার ক্রাইম থানায় রিংকি চট্টোপাধ্যায় সিং নামের স্থানীয় এক আইনজীবী এই লিখিত অভিযোগটি দায়ের করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় অত্যন্ত ‘হাই-প্রোফাইল’ এই মামলাটি পুলিশ শুরুতে নথিবদ্ধ করতে গড়িমসি করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার দায়েরকারী আইনজীবী রিংকি চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছেন, থানায় কয়েক দফা দীর্ঘ যোগাযোগ এবং আইনি চাপ সৃষ্টির পর অবশেষে পুলিশ এফআইআর (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) দায়ের করতে বাধ্য হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫১ (অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন), ৩৫২ (শান্তিভঙ্গের উদ্দেশ্যে অপমান), ৩৫৩ (উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর বিবৃতি ছড়ানো) এবং ২৯৯ (ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত করা) ধারায় মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। শিলিগুড়ি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, এফআইআরে উল্লিখিত প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে তদন্তপ্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে আইনজীবী রিংকি চট্টোপাধ্যায় দাবি করেন, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি পৃথক বিতর্কিত বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে একটি বক্তব্য তিনি দিয়েছিলেন ২০২৫ সালের পবিত্র ঈদুল ফিতরের এক অনুষ্ঠানে এবং অপর বক্তব্যটি দিয়েছিলেন ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে কলকাতার ধর্মতলার একটি ধর্নামঞ্চ থেকে। এই দুটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা উসকানিমূলক পরিবেশ তৈরি করে বলে অভিযোগে বলা হয়।
ভারতের প্রভাবশালী বার্তা সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওই আইনজীবী বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে হিজাব পরে কলকাতার রেড রোডে ঈদের নামাজে যোগ দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে হিন্দুধর্মকে ‘নোংরা ধর্ম’ বলে অভিহিত করেছিলেন।” মূলত হিন্দিতে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ থেকে ব্যবহৃত ‘গান্দা ধর্ম’ (নোংরা ধর্ম) শব্দটিই এই তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয় এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
তবে তৎকালীন সময়ে এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আমি রামকৃষ্ণের প্রকৃত ধর্ম মানি, স্বামী বিবেকানন্দের উদার ধর্ম মানি। কিন্তু জুমলা পার্টিরা (বিজেপি) রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে যে নোংরা ধর্ম বানিয়েছে, আমি তা মানি না। ওটা মূলত আসল হিন্দু ধর্ম বিরোধী।” মমতার এই ব্যাখ্যা সত্ত্বেও বিতর্ক থামেনি এবং বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালত ও থানা পর্যন্ত গড়ায়।
মামলাকারী আইনজীবী রিংকি চট্টোপাধ্যায় পুলিশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে বলেন, ‘আমি যখন প্রথম সাইবার ক্রাইম শাখায় এফআইআর করতে যাই, তখন তা গ্রহণ না করে দিনের পর দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ হওয়ায় পুলিশ গড়িমসি করায় আমি চরম শারীরিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হয়েছি।’ তিনি আরও দাবি করেন, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ধর্মতলায় হিন্দু ভোটারদের পরোক্ষ হুমকি দিয়ে আরও কিছু বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, যা একজন সাধারণ হিন্দু ও সমাজকর্মী হিসেবে তাকে চরম শঙ্কিত করে তোলে।
সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন স্পর্শকাতর মামলা দায়ের করার পর নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও গভীর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকে আমি প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক হামলার ভয় পাচ্ছিলাম। সবার জানা উচিত যে বাকস্বাধীনতারও একটা নির্দিষ্ট আইনি সীমা আছে।’ প্রথমে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর আইনি লড়াইয়ের মুখে অভিযোগ গৃহীত হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কঠোর ধারাগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে বলে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন।
