রাজধানীর সবচেয়ে বড় কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট উত্তরা দিয়াবাড়িতে গভীর রাতে মাইকিং করে খামারী ও বেপারীদের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো. শেখ ফরিদ হোসেনের মালিকানাধীন ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ‘এস এফ করপোরেশন’-এর বিরুদ্ধে এই গণ-চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছেন হাটে আসা ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে হঠাৎ হাটের মাইকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিটি গরুর জন্য বাধ্যতামূলক এক হাজার টাকা করে দাবি করা হয়।
ভুক্তভোগী খামারী ও বেপারীরা জানান, এবারের ঈদে এই হাটে অন্তত দুই থেকে আড়াই লাখ কোরবানির পশু এসেছে। সেই হিসেবে প্রতিটি পশু থেকে এক হাজার টাকা করে আদায় করা হলে এই অবৈধ চাঁদার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এস এফ করপোরেশনের কর্মীরা কখনো একে ‘শেড খরচ’ আবার কখনো ‘বকশিস’ হিসেবে অভিহিত করে পশুর মালিকদের এই টাকা দিতে বাধ্য করছে, যা নিয়ে খোদ স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতির ইজারা নেওয়া হাটের ব্যবস্থাপনা ও নৈতিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
পাবনা থেকে আসা পশু চিকিৎসক ও খামারী আজিজুল হক জানান, হাটে পানি নিষ্কাশনের চরম অব্যবস্থাপনা, কাদা-পানি আর টয়লেট সংকটের কারণে এমনিতেই পশুর কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। যার ফলে তাঁর নিজের ১৩টি গরুতে প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর ওপর রাসেল, তুষার ও মনসুরসহ ইজারাদারের বেশ কয়েকজন লোক এসে তাকে শাসিয়ে প্রতি গরুর জন্য এক হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেছে। তাঁর গরু শেডের বাইরে খোলা আকাশের নিচে থাকার পরও জোরপূর্বক এই টাকা নেওয়া হয়েছে বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান তিনি।
একইভাবে কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে ১০টি গরু নিয়ে আসা মো. মাসুদ রানা এবং চুয়াডাঙ্গার মো. হাবিব ইজারাদারদের এই জোরজুলুমের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ৪টি গরু বিক্রি করে ৬০ হাজার টাকা লোকসান করা হাবিব জানান, একে তো হাটে কোনো নিরাপত্তা নেই, উপরন্তু কাদা-পানির দুর্ভোগের মধ্যে এই চাঁদা আদায় যেন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’। নাটোরের সিংড়া থেকে আসা আব্দুস সবুর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পশুর হাসিল থেকেই তো ইজারাদারের সব খরচ ও লাভ ওঠার কথা, সেখানে বেপারীদের ওপর এমন জুলুমের কারণে তারা আর কখনোই এই হাটে আসবেন না।
নজিরবিহীন এই চাঁদাবাজির বিষয়ে সরেজমিনে দিয়াবাড়ি হাটের এক নম্বর স্টলে গিয়ে দেখা যায়, চাঁদার টাকা নিয়ে ইজারাদারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ভলেন্টিয়ারের সাথে এক বেপারীর তীব্র বাক-বিতন্ডা চলছে। উমর ফারুক নামের গলায় ইজারা প্রতিষ্ঠানের কার্ডধারী এক ব্যক্তি ওই বেপারীকে ধমক ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে বাধ্য করেন। বড় খামার ‘নাছির এগ্রো ফার্ম’-এর ডিরেক্টর অপিও জানান, প্রতিটি গরুর ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা হাসিল পাওয়ার পরও ইজারাদারের এমন বাড়তি টাকা দাবি করার বিষয়টি অত্যন্ত অনৈতিক।
এই বিপুল অংকের চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়ীদের হয়রানির বিষয়ে কথা বলার জন্য ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এস এফ করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী তথা ঢাকা উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মো. শেখ ফরিদ হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি প্রথমে ফোন ধরেননি। পরবর্তীতে হাটের হাসিল ঘরে তাঁর সাথে সরাসরি দেখা করে পরিচয় দিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে এড়িয়ে যান এবং রাতে ফোন করতে বলেন। তবে পরবর্তীতে রাতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নীতিমালা অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত হাসিল ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে বা কোনো উপায়েই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ ইজারাদারের নেই। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট নীতিমালার বাইরে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতার ইজারা নেওয়া হাটে এমন জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের (মোবাইল কোর্ট) মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
