বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো ধরনের পূর্বসমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ এবং চরম পরিকল্পনাহীনতার কারণে ঢাকাবাসীকে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহের একটি মহৎ উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে থাকা হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের দুটি অত্যাধুনিক পশু জবাইখানা নির্মাণে জনগণের মোট ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তা বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেগা অপচয়ের কারণে কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি এখন ধুলার আস্তরে ঢেকে বিকল হওয়ার মুখে পড়েছে।
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের আগস্টে ৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে হাজারীবাগের আধুনিক পশু জবাইখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন তড়িঘড়ি করে এটি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দিন লোকদেখানো হিসেবে একটি গরু জবাই করা হলেও গত সাত বছরে এই কেন্দ্রে আর কোনো পশু জবাই হয়নি। অথচ এই জবাইখানায় প্রতি ঘণ্টায় ৩০টি গরু ও ৬০টি ছাগল স্বয়ংক্রিয়ভাবে জবাই করার সক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে এর প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে কাপ্তানবাজারের পশু জবাইখানাতেও। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটির নির্মাণে খরচ হয়েছে ৫২ কোটি টাকা। এই আধুনিক কেন্দ্রে ঘণ্টায় ১৪টি গরু ও ৩০টি ছাগল জবাই করার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও রক্ত-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু চালুর কোনো বাস্তবসম্মত উদ্যোগ না থাকায় এটিও উদ্বোধনের পর থেকে বছরের পর বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো ধরনের বাজার সমীক্ষা ছাড়াই সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। কোথা থেকে পশু আসবে, কীভাবে আসবে এবং জবাইয়ের পর মাংস কীভাবে দ্রুত বাজারে সরবরাহ করা হবে— এসব বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন ছিল না। এর বড় কারণ ইজারা না হওয়া এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সক্ষমতার ঘাটতি। হাজারীবাগের জবাইখানাটি প্রথমে ৮ কোটি ৫৬ লাখ এবং পরে দর কমিয়ে ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কোনো মাংস ব্যবসায়ী দরপত্র জমা দেননি।
বাজারের বাস্তবতায় দেখা যায়, ঢাকার মাংস ব্যবসায়ীরা বর্তমানে কোনো ধরনের ফি বা পরিবহন খরচ ছাড়াই নিজেদের দোকানের সামনে কিংবা অলিগলিতে নিজেদের মতো করে পশু জবাই করছেন। সরকারি আইনের তোয়াক্কা না করে খোলা স্থানে পশু জবাইয়ের এই চল বন্ধ না করা পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ী বাড়তি টাকা ও সময় খরচ করে আধুনিক জবাইখানায় যাবেন না। ফলে কোটি কোটি টাকার এই স্থাপনা এখন ডিএসসিসির জন্য একটি বড় ব্যর্থতার স্মারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি এই দুটি অচল জবাইখানা নতুন করে চালু করার উদ্দেশ্যে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এই বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম জানান, কীভাবে আধুনিক এই পশু জবাইখানা দুটি দ্রুত চালু করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে গুরুত্বের সাথে ভাবা হচ্ছে এবং যেকোনো উপায়ে এগুলোকে সচল করার চেষ্টা চলছে।
তবে নগর–পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু কাগুজে কমিটি গঠন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রথমে স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষার মাধ্যমে যন্ত্রপাতি সচল আছে কি না তা দেখতে হবে। একই সঙ্গে ইজারামূল্যকে শুধু রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে না দেখে প্রথম ১-২ বছর কম ফি বা সরকারি-বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করতে হবে। ধাপে ধাপে আইন প্রয়োগ করে খোলা স্থানে পশু জবাই বন্ধ এবং ফিটনেস সনদ ছাড়া মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করা না গেলে জনগণের এই বিপুল অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে না।
