মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে মাত্র চারদিনের ব্যবধানে নির্মমভাবে দুই কন্যাশিশুর আকস্মিক মৃত্যুতে দুটি পরিবারে এখন চলছে বুকফাটা আর্তনাদ ও শোকের মাতম। একদিকে গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে এক দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়, যার পৈতৃক বাড়ি সিরাজদীখানের মধ্যম শিয়ালদী গ্রামে। অন্যদিকে, এর মাত্র চারদিন আগে ১৬ মে সিরাজদীখানের খাসকান্দি মদিনা পাড়া গ্রামে ১০ বছরের আরেক তৃতীয় শ্রেণির শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে তার আপন সৎ মামা।
দুটি ঘটনাই ছিল চরম নৃশংস এবং দুটি পরিবারই হারিয়েছে তাদের নিষ্পাপ সন্তানকে। তবে এই সমজাতীয় দুই হত্যাকাণ্ডের পর সমাজের উচ্চমহল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও ভূমিকা যেন তৈরি করেছে এক চরম বৈষম্যের গল্প। একই উপজেলার দুই সন্তানের সাথে হওয়া অন্যায়ের পর দুই রকম সামাজিক ও সরকারি আচরণ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে এখন তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা। নিহত রামিসা ছিল ঢাকার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। এই হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীর ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি নিয়ে বিচার চেয়ে ক্ষোভের ঝড় ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিহত রামিসার দুঃখী পরিবারের খোঁজ নেওয়ার পর ঢাকার ঘটনাস্থল এবং সিরাজদীখানের গ্রামের বাড়িতে ভিড় বাড়তে থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদস্থ জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের। সমবেদনা ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি সেখানে একশ্রেণির মানুষের ছবি ও ভিডিও ধারণের হিড়িক পড়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় গ্রামবাসী।
অথচ এর ঠিক চারদিন আগে, অর্থাৎ ১৬ মে সিরাজদীখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসকান্দি মদিনা পাড়া গ্রামে ১০ বছরের শিশু আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে তার সৎ মামা রাজা মিয়া। আছিয়া ছিল স্থানীয় চর খাসকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার পরপরই এলাকাবাসী ধাওয়া করে ঘাতক অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছিল।
দুঃখজনক বিষয় হলো, রামিসার ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল হলেও আছিয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি প্রশাসনের শীর্ষ কোনো কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী কোনো নেতা। খাসকান্দির সেই ছিমছাম ছোট্ট ধূলিমলিন বাড়িতে আজ পর্যন্ত দেখা মেলেনি কোনো জনপ্রতিনিধি বা এমপির ভিড়। স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, দুটি শিশুই নির্মম অপরাধের শিকার হওয়ার পরও এক ঘটনায় দেশ কাঁপবে আর অন্য ঘটনায় সমাজ সম্পূর্ণ নীরব থাকবে কেন?
এদিকে আছিয়া হত্যাকাণ্ডের আইনি বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উল্টো স্থানীয় পুলিশের বিরুদ্ধে উঠেছে চরম দায়িত্বে অবহেলা ও অনৈতিক অর্থ দাবির অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। নিহত আছিয়ার বাবা কাতার প্রবাসী আনোয়ার হোসেন মেয়ের অকাল মৃত্যুর খবর শুনে সব ফেলে দেশে ফিরে এসেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এতদিন পার হয়ে গেলেও এখনও তাঁর মেয়ের ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কথা বললেই ইনিয়ে-বিনিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করেন। ডিএনএ টেস্টের তাগিদ দিলে তিনি ঢাকা যাওয়ার গাড়ি ভাড়ার টাকা চান বলে প্রবাসী বাবা অভিযোগ করেন।
নিহত আছিয়ার মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কোল খালি করা খুনি সৎ মামার দ্রুত ফাঁসি চান তিনি। তারা অত্যন্ত অসচ্ছল ও অসহায় মানুষ, স্বামী ঋণ করে কাতার গিয়েছিলেন কিন্তু মেয়ের টানে সব হারিয়ে চলে এসেছেন। এখন মেয়ের খুনের বিচার চাইতে গেলে উল্টো পুলিশের কাছে টাকা দিতে হচ্ছে, যেখানে তাদের নিজেদেরই এখন খেয়ে-পরে চলার মতো কোনো সামর্থ্য অবশিষ্ট নেই।
অর্থ দাবির এই স্পর্শকাতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিরাজদীখান থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) শাহ আলী টাকা চাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি জানান, ঈদের ছুটির কারণে ল্যাব বন্ধ থাকায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে এবং ছুটির পর পরই ডিএনএ টেস্ট করানো হবে। এছাড়া বাকি সব আলামত মিলে গেলে যত দ্রুত সম্ভব আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
সিরাজদীখান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাবিবুর রহমানও জানান যে, আছিয়া হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি ল্যাব থেকে ডিএনএ টেস্ট এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত মেডিকেল রিপোর্ট আসলেই আদালতে দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দেওয়া হবে। ঈদের ছুটির পর এই কাজের পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।







