ইরানের বিতর্কিত ‘হরমুজ প্রণালি রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায়কারী কর্তৃপক্ষ কমিটি’-র ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি (অর্থ) মন্ত্রণালয়। গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে এই নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি মন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের এই কমিটি গঠনকে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামি শাসকগোষ্ঠীর একটি ‘উন্মত্ত পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এক বার্তায় তিনি বলেন, বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য থেকে আইন বহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের জন্য ইরানি সামরিক বাহিনীর এই সর্বশেষ প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, ‘অর্থনৈতিক উন্মত্ততা’ দেশটির শাসকগোষ্ঠীকে নগদ অর্থের জন্য কতটা মরিয়া করে তুলেছে।
আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরকে সংযুক্তকারী ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই হরমুজ প্রণালি মূলত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে পৃথিবীর মোট উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত জ্বালানি পণ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশই এই সরু প্রণালিটি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে।
চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচলের ওপর হরমুজ প্রণালিতে আকস্মিক অবরোধ জারি করে ইরান। পরবর্তীতে দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, এখন থেকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে যেকোনো বিদেশি জাহাজ চলাচল করতে হলে ইরানকে নির্দিষ্ট হারে আন্তর্জাতিক টোল বা ফি প্রদান করতে হবে।
একই সঙ্গে তেহরানের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয় যে, হরমুজ প্রণালির জলসীমায় যদি কখনো যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের পতাকাবাহী কোনো বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজ দেখা যায়, তবে দেখামাত্রই সেটিকে লক্ষ্য করে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা চালানো হবে।
পরবর্তীতে এই কর আদায়ের ইস্যুটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রীতিমতো একটি নতুন আইন প্রণয়ন করে ইরানের পার্লামেন্ট। সেই বিতর্কিত আইন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইরানের নিজস্ব কমান্ডের ওপর এবং বিদেশি জাহাজগুলোকে অবশ্যই এই প্রণালির বৈধ কর্তৃপক্ষকে টোল দিতে বাধ্য করা হয়। ইতোমধ্যে ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের’ (আইআরজিসি) সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ ‘হরমুজ প্রণালি কর্তৃপক্ষ কমিটি’ গঠন করে কার্যক্রমও শুরু করা হয়েছে।
তবে শুরু থেকেই ইরানের এই একতরফা পদক্ষেপের তীব্র ও কঠোর সমালোচনা করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিশ্বের বিভিন্ন বাণিজ্যিক রাষ্ট্র। তাদের প্রধান আইনি যুক্তি হলো, বৈশ্বিক সমুদ্র আইন অনুসারে কোনো মুক্ত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথের ওপর কোনো একক দেশ বা শক্তি নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না; যদি কোনো দেশ এমন পদক্ষেপ নেয়, তবে সেটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ও অবৈধ বলে গণ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা ওই বিবৃতিতে আরও একটি কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা সংস্থা ইরানের এই তথাকথিত হরমুজ প্রণালি কর্তৃপক্ষকে কোনো প্রকার লজিস্টিক বা কূটনৈতিক সহযোগিতা করে, কোনো বাণিজ্যিক টোল প্রদান করে কিংবা তাদের কাছ থেকে কোনো উপকার বা পরিষেবা গ্রহণ করে, তবে সেই সহযোগী দেশ বা সংস্থাকেও আমেরিকার এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে।







