ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর কাছে নতুন সহায়তা কর্মসূচির আবেদন করেছে বাংলাদেশ সরকার।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সংস্কার পরিকল্পনা ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আইএমএফ বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
সহায়তার পরিমাণ এখনও নির্ধারণ হয়নি। তবে মার্চে সরকার জানিয়েছিল, যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল প্রায় ৬৬ ডলার।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি এখনও ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় তেল ও এলএনজির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এতে দেশে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। সরকার ইতোমধ্যে কিছু সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখেছে এবং জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
পোশাক খাতে প্রভাব
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পও চাপে পড়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্কয়ার ডেনিমের পরিচালক সাইদ আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী মৌসুমে কাজের অর্ডার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ফ্লাইট বাতিল করায় বড় বড় ব্র্যান্ডের জন্য পাঠানো পোশাকের চালানও আটকে যায়।
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি
সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় প্লাস্টিক শিল্পসহ অন্যান্য খাতেও চাপ বেড়েছে। ক্রুড অয়েলের দাম বাড়ার কারণে রেজিনের দাম প্রতি টনে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
বাড়ছে বিদেশি ঋণ
অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১,১৩৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক
বাংলাদেশ বর্তমানে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ৫৭০ কোটি ডলারের আইএমএফ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠকে দ্রুত নতুন সহায়তা কর্মসূচি চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাংকও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে।
বৈশ্বিক ঋণ ঝুঁকি
আইএমএফ সতর্ক করেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।







