যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো আকস্মিক বা প্রথম পারমাণবিক হামলা থেকে নিজেদের কৌশলগত সমরাস্ত্রভাণ্ডার সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে এক অভিনব ও নজিরবিহীন সামরিক কৌশল হাতে নিয়েছে চীন। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত ও প্রতিকূল মরুভূমিতে বেইজিং গড়ে তুলছে এক সুবিশাল ও সুসংগঠিত গোপন সামরিক অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিশেষ পর্যালোচনা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই নতুন দুর্গটি এমন এক মহাপরিকল্পনায় তৈরি করা হচ্ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্ভাব্য আকস্মিক হামলায় চীনের পারমাণবিক শক্তি একযোগে পুরোপুরি ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে বেইজিং যেকোনো পরিস্থিতিতে টিকে থেকে পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়ার সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে। উল্লেখ্য, চীনের দূরপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।

সম্প্রতি রয়টার্সের হাতে আসা কিছু উচ্চ-প্রযুক্তির উপগ্রহচিত্রে (স্যাটেলাইট ইমেজ) চীনের এই গোপন ও সুবিশাল সামরিক তৎপরতার চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, দেশটির পূর্ব সিনচিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক সাইলো (ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার) এলাকাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এক জটিল সামরিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—বিশাল আকৃতির তিনটি রহস্যময় অষ্টভুজাকৃতির সামরিক স্থাপনা।
কৌশলগতভাবে নির্মিত উত্তরের অষ্টভুজটি মূলত সেনা সদস্যদের থাকার আধুনিক ব্যবস্থা, সামরিক যান এবং ছদ্মবেশী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলের এক জটিল সংমিশ্রণ। এর ঠিক আশপাশেই রয়েছে শক্তিশালী বাঙ্কার, আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডার, বিমানঘাঁটি ও উন্নত রেলসংযোগ, যা সরাসরি মূল পারমাণবিক সাইলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণের অষ্টভুজে অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার ও ফুয়েল ডিপো বা জ্বালানি সংরক্ষণাগারের মতো স্পর্শকাতর অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
লপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের দক্ষিণে অবস্থিত তৃতীয় অষ্টভুজটি সম্ভবত সেনাদের যুদ্ধ মহড়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে স্যাটেলাইটে পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের আদলে তৈরি বেশ কিছু নকল বা ডামি বিমানও মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। এ ছাড়া মরুভূমির পাহাড়ি পাথর ও শুকনো খালের আড়ালে কংক্রিটের তৈরি ৮০টিরও বেশি মোবাইল লঞ্চ প্যাড বা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণকেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো মূলত সড়কপথে চলাচলকারী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য তৈরি।
এই সুবিশাল মরুভূমিতে কমান্ড ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের জন্য মাটির নিচে হাজার হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক কেবল বিছানো হয়েছে। সেই সঙ্গে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিশ ও বিশাল টাওয়ারের মাধ্যমে একটি নিটোল ইলেকট্রনিক যুদ্ধ (Electronic Warfare) ও অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। চীনের আনুষ্ঠানিক পরমাণু নীতি হলো—তারা কখনোই কোনো দেশের ওপর প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে আক্রান্ত হলে যেন শতভাগ শক্তির সঙ্গে পাল্টা ধ্বংসাত্মক জবাব দেওয়া যায়, সেটাই তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই দ্রুত সামরিক আধুনিকায়ন মূলত তাইওয়ান সংকটকে সামনে রেখেই করা হচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের ভুল বোঝাবুঝি পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক জায়গায়’ নিয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারণা, তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকার সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ থামাতে চীন মূলত এই বিশাল পারমাণবিক শক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চীন বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। সামরিক ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের কাছে অন্তত এক হাজারটি সচল পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকবে। এ ছাড়া চীন তার নিজস্ব ‘হুয়োইয়ান-১’ উপগ্রহব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। ফলে মূল হামলা চীনের মাটিতে আঘাত হানার আগেই বেইজিং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দিতে সক্ষম।
সাধারণত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া তাদের পারমাণবিক সুরক্ষার জন্য কেবল সাইলোর ভৌগোলিক দূরত্ব ও কংক্রিটের মজবুত ভূগর্ভস্থ কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। কিন্তু চীন যেভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং বিশাল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের এক নজিরবিহীন মহাপরিকল্পনা মরুভূমিতে বাস্তবায়ন করছে, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক তথ্য প্রকল্পের পরিচালক হ্যানস ক্রিস্টেনসেন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এত প্রতিকূল পরিবেশে এত বড় অবকাঠামো তিনি এর আগে কখনো দেখেননি এবং এটি সত্যিই চীনের এক অসাধারণ ও অভাবনীয় সামরিক প্রচেষ্টা।







