১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক নাটকীয় সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ৪৩ বছর আগের এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড এবং এর পরবর্তী এক সপ্তাহের ঘটনাবলি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রথম সাত দিন ছিল চরম ঘটনাবহুল এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
হত্যাকাণ্ডের আগের দিন, অর্থাৎ ২৯ মে political বিরোধ মেটাতে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম যান জিয়াউর রহমান। ওই দিন মধ্যরাতে তিনি সার্কিট হাউজে ঘুমাতে গেলে সেনাবাহিনীর একটি দল তাঁর ওপর অতর্কিত গুলি চালায়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান। ঘটনার পর ৩০ মে সকাল সাতটায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে খবরটি প্রথমবারের মতো প্রচার করা হয়। তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের বরাত দিয়ে এই মৃত্যুর খবর ঘোষণার আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনের কর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি তিন বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করেন এবং দেশের পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ও আগের চুক্তিগুলো সচল রাখতে বেতার ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। একই সাথে দেশে সামরিক শৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৩০ মে থেকেই সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা জারি এবং ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই জিয়াউর রহমানের মরদেহ গোপনে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা রাঙ্গুনিয়ার একটি পাহাড়ের পাদদেশে কবর দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে পহেলা জুন ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ গ্রামীণ মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে সেই গোপন কবরের সন্ধান রাখেন। মাটি খুঁড়ে জিয়াউর রহমানসহ অপর দুই কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম সেনানিবাস হয়ে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয় এবং সংসদ ভবনের পাশে ক্রিসেন্ট লেকের উত্তর পাশে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
এদিকে অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রাম শহরে সান্ধ্য আইন জারি করা হয় এবং ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের টেলিযোগাযোগ ও আকাশপথের সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অভ্যুত্থানকারীরা নিজেদের ‘বিপ্লবী পরিষদ’ দাবি করে জেনারেল মঞ্জুরের মাধ্যমে বেতার থেকে সেনাপ্রধান এরশাদকে বরখাস্তের ঘোষণা দেয়। তবে এই অভ্যুত্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ৩১ মে দুপুরের মধ্যে এরশাদের দেওয়া আত্মসমর্পণের নির্দেশ এবং সাধারণ ক্ষমার ঘোষণার পর বিদ্রোহী সৈনিকদের মধ্যে তীব্র বিভক্তি দেখা দেয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ৩১ মে রাতেই পরিবারসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যান মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও তাঁর সহযোগীরা। এর পর পরই মঞ্জুরকে জীবিত বা মৃত ধরার জন্য পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে সরকার। পালিয়ে যাওয়ার পথে অন্য দুই কর্মকর্তা সেনা গুলিতে নিহত হন এবং জেনারেল মঞ্জুর একটি চা বাগানের কুলির বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আত্মসমর্পণ করলে পুলিশ তাঁকে আটক করে সেনানিবাসে নিয়ে যায়, যেখানে পরবর্তীতে রহস্যজনক গোলাগুলিতে তিনি নিহত হন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সৈন্যদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম নেয়। পরবর্তীতে ‘বিদ্রোহের’ দায়ে ১৮ জন সামরিক কর্মকর্তার বিচার করা হয়, যার মধ্যে ১৩ জনের ফাঁসি হয়। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিভিন্ন ব্যারাকে গিয়ে সৈন্যদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে সেনাবাহিনীতে নিজের একক প্রভাব সুদৃঢ় করেন এবং নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের কৌশলে অবসরে পাঠিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
