ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত কারণেই বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে সারা বছর দেশীয় বাজারের তুলনামূলক অনেক বেশি পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়ে থাকে। এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ঘিরে একসময় বন্দরনগরীতে গড়ে উঠেছিল ২২টি ট্যানারি শিল্প। তবে সময়ের নির্মম ব্যবধানে এবং নানা সংকটে বর্তমানে প্রায় সবকটি ট্যানারিই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রতি বছর পবিত্র কোরবানির মৌসুমে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রধান সড়কে হাজার হাজার অবিক্রীত ও নষ্ট হওয়া পশুর চামড়া স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখা যায়। জাতীয় মূল্যবান সম্পদের এমন ভয়াবহ অপচয় রোধে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
অথচ দেশের রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে চামড়া খাতের অবদান অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। গেলো অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রায় ১১৫ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৯৯ কোটি ডলারের পণ্য। সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশা, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই চামড়া খাতকে ভবিষ্যতে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল শিল্পে পরিণত করা অনায়াসেই সম্ভব। কিন্তু সম্ভাবনার এই খাতের মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এক করুণ গল্প বলছে।
প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক স্থানে কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বিপুল পরিমাণ পশুর কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়ে সড়কে বা ডাস্টবিনে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে পরিবেশ দূষণ রক্ষার্থে এসব পচে যাওয়া চামড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অপসারণ করতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে। বিনামূল্যে লবণ বিতরণসহ সরকারের পক্ষ থেকে নানা কাগুজে উদ্যোগের কথা বলা হলেও, জাতীয় এই মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণে তার কোনো কার্যকর প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না বলে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসময় চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি সচল থাকলেও বর্তমানে নামমাত্র মাত্র একটি ট্যানারি কোনোমতে চালু রয়েছে। একইভাবে কাঁচা চামড়ার ব্যবসা কমে যাওয়ায় প্রায় ১৩০ জন আড়তদারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ জনে এসে ঠেকেছে। আড়তদারদের মূল অভিযোগ হলো, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা তাদের কাছ থেকে চামড়া কিনে নিয়ে বছরের পর বছর পার হলেও বকেয়া পাওনা অর্থ পরিশোধ করছেন না। দীর্ঘদিন ধরে টাকা আটকে থাকায় আড়তদাররা চরম মূলধন সংকটে পড়েছেন, যার ফলে কোরবানির মৌসুমে পর্যাপ্ত চামড়া নগদ টাকা দিয়ে কেনার সামর্থ্যও হারাচ্ছেন অনেক ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মোসলেম উদ্দীনের মতে, ট্যানারি মালিকেরা আড়তদারদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে চামড়া সংগ্রহ করে না। তারা প্রতি ফুট চামড়ার দাম মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করার কারণে আড়তদারদের বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। চামড়া নষ্ট হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো আধুনিক ও পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ সুবিধার তীব্র অভাব। তাই সরকারি উদ্যোগে যদি দ্রুত আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তবেই কেবল এই জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।
সংগঠনটির আরেক শীর্ষ নেতা সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান জানান, তীব্র যানজটের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চামড়া শহরের আড়তে আসতে অনেক বিলম্ব ঘটে, যার ফলে চামড়ার গুণগত মান বা ফিনিশিং নষ্ট হয়ে যায়। সিটি করপোরেশন এলাকায় যদি বিশেষ কোল্ড স্টোরেজ বা হিমায়িত ঘর তৈরি করা হয়, তবে ব্যবসায়ীরা চামড়া দীর্ঘ সময় ভালো রাখতে পারবেন। যদিও সরকার চামড়া সংরক্ষণে সহায়তা দিতে এবার মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডগুলোর জন্য চট্টগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ এক হাজার ৫ টন লবণ বিনামূল্যে বরাদ্দ দিয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু লবণ সরবরাহ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ট্যানারিতে বিক্রি—পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর সরকারি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুস মনে করেন, কাঁচা চামড়া কেনার পর সরকারি মারফতে যদি তা রাখার ও বিক্রির সুব্যবস্থা করা হয়, তবে এই ব্যবসায় আবার নতুন উদ্যোক্তা বাড়বে এবং দেশের সম্পদ নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচবে। চামড়া খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ে নানা ছোটখাটো উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঢাকার সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি পুরোপুরি সচল করা এবং ট্যানারিগুলোর আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদ অর্জন নিশ্চিত করা না গেলে, রপ্তানি আয়ের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে কঠিন।
