ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছেন?’ এবং এই সত্য তিনি জানেন উল্লেখ করে বলেন, তা প্রকাশ করলে ‘বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠবে’। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর দেশের স্বার্থে হাদির খুনিদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি গোপন রাখতে মমতাকে ফোন করে চাপ দিয়েছিলেন বলেও তিনি গুরুতর অভিযোগ করেছেন।
এই বিবৃতির মাধ্যমে ওসমান হাদি হত্যায় ভারতের সংশ্লিষ্টতা এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর যুক্ত থাকার সুস্পষ্ট আভাস প্রকাশ্যে আসলো। তবে এই ঘটনার পর প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশে ‘র’-এর এসেট হিসেবে ঠিক কারা কাজ করেছে— এখানকার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি নাকি কোনো বিশেষ সংস্থা?
তদন্তের তথ্যমতে, হাদির হত্যাকারীরা দুপুর আড়াইটা থেকে রাত পৌনে এগারোটা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘতম পথ পাড়ি দিয়ে নেত্রকোনা সীমান্তে পৌঁছায়। সেখানে তারা চোরাচালানের একটি অত্যন্ত সুপরিচিত রুট ব্যবহার করে, যা সম্পর্কে বিজিবি আগে থেকেই অবগত ছিল। ওই পয়েন্টে দুটি পাইপ সুড়ঙ্গ আছে, যা দিয়ে মূলত মানবপাচার হয়ে থাকে।
যেখানে বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যেই দেশের সব সীমান্ত সিল করার স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেখানে বর্ডার গার্ড চৌকির মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের এই রুট ও পয়েন্ট সিল করতে ব্যর্থ হওয়াটা অবিশ্বাস্য। সাড়ে চার ঘণ্টা পরেও এই পয়েন্টটি বিজিবির নিয়ন্ত্রণে না আসা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যর্থতা নয় এবং এ বিষয়ে বিজিবি প্রধানকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
তদুপরি, একটি ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা সন্ধ্যার আগেই খুনিদের নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে একাধিক পাবলিক পোস্ট দিয়েছিল। অথচ রাষ্ট্রের প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একই কাজ করতে অর্থাৎ অফিশিয়ালি খুনিদের শনাক্ত করতে সময় নিয়েছে রাত সাড়ে দশটা থেকে পৌনে এগারোটা পর্যন্ত।
সূত্রমতে, ঠিক রাত ১০টা ৪৮ মিনিটের দিকে খুনিরা সীমান্ত পার হয়েছে এমন বার্তা এসেছে। অর্থাৎ খুনিদের সীমান্ত অতিক্রম করার ঠিক কাছাকাছি সময়েই এনটিএমসি (NTMC) এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অফিশিয়ালি খুনিদের শনাক্ত করতে পেরেছে। এই বিষয়টি কি নিছক একটি কাকতালীয় ঘটনা, নাকি এখানে কারও কারও সুপরিকল্পিত নিষ্ক্রিয়তা ছিল— সেই প্রশ্ন এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, খুনিরা প্রথমে মোটরসাইকেলে আগারগাঁও যায় এবং সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আমিনবাজার পৌঁছায়। এরপর মানিকগঞ্জের কালামপুর হয়ে একটি প্রাইভেটকারে চড়ে সরাসরি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে যায় তারা। হালুয়াঘাটের মুন ফিলিং স্টেশনের আগে ফিলিপ ও সঞ্জয় নামের দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাদের গ্রহণ করে এবং ফিলিপ তাদের সীমান্ত পার করে ভারতে পুত্তি নামের এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে।
এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও তাদের ধরতে না পারা নিঃসন্দেহে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বড় ব্যর্থতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চিহ্নিত করার আগেই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী খুনিরা সীমান্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হওয়াটা দেশের ভয়ানক দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকার (কিংবা আপসকৃত সক্ষমতার) সুস্পষ্ট প্রমাণ, যার স্থায়ী সমাধান জরুরি।







