বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন এক মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। প্রায় চার দশক পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। ফলে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব ও গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর গোপন ভোটে খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। জাতিসংঘের আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতায় এবার সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির প্রধান দায়িত্ব হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা সমন্বয় করা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে সহায়তা করা। সভাপতিকে নিরপেক্ষ থেকে সব দেশের মতামত বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক পরিচালক ড. সেলিম জাহানের মতে, এই পদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, যাতে কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে।
খলিলুর রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, যখন বিশ্ব নানা সংকটের মুখোমুখি। একই সঙ্গে এ সময়েই জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বর্তমান মহাসচিব António Guterres-এর মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে।
তবে সাধারণ পরিষদের সভাপতি জাতিসংঘের প্রশাসনিক প্রধান নন। সংস্থাটির নির্বাহী ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেন মহাসচিব।
সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবিরের মতে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন। এসব সিদ্ধান্ত কখনো ভোটের মাধ্যমে, আবার কখনো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
প্রতি বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতারা অংশ নেন। তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করাও সভাপতির অন্যতম দায়িত্ব।
সাধারণ পরিষদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের বাজেট অনুমোদন। বিশেষ করে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের বাজেট এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়ন সাধারণ পরিষদের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। এ কারণে বাজেট সংক্রান্ত আলোচনায় সভাপতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া নিরাপত্তা পরিষদ কোনো বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হয়। সেক্ষেত্রেও আলোচনার নেতৃত্ব দেন সাধারণ পরিষদের সভাপতি।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সংকট, জাতিসংঘ সংস্কার এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খলিলুর রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণ শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিসরে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
