দুই দিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ঢাকা সফরকে ঘিরে শুধু বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার নাম। কূটনৈতিক মহলে অনেকের কাছেই তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে হাকান ফিদান বাংলাদেশ সফর করছেন। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন।
সেনা সদস্য থেকে কূটনৈতিক কৌশলবিদ
১৯৬৮ সালে আঙ্কারায় জন্মগ্রহণকারী হাকান ফিদানের কর্মজীবন শুরু হয় তুর্কি সেনাবাহিনীতে। সামরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। ন্যাটোর একটি মিশনে দায়িত্ব পালনকালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে বিলকেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
তার গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা, যা পরবর্তীকালে তার পেশাগত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
এরদোয়ানের আস্থার কেন্দ্রে
রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্কের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হাকান ফিদানের উত্থান শুরু হয়। ২০০৩ সালে তাকে তুরস্কের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (টিকা)-এর প্রধান করা হয়। এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও বলকান অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
তার দক্ষতা ও কৌশলগত চিন্তাভাবনা দ্রুতই এরদোয়ানের আস্থা অর্জন করে। পরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
গোয়েন্দা সংস্থার দীর্ঘ নেতৃত্ব
২০১০ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির প্রধান হন হাকান ফিদান। প্রায় ১৩ বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করে তিনি সংস্থাটিকে আধুনিক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের নেতৃত্ব দেন।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান মোকাবিলা এবং সিরিয়া, লিবিয়া ও ইউক্রেন-সংক্রান্ত বিভিন্ন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক উদ্যোগে তার ভূমিকা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এ কারণেই অনেকেই তাকে তুরস্কের ক্ষমতার কেন্দ্রের ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা গোপন তথ্যের বিশ্বস্ত রক্ষক হিসেবে অভিহিত করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নতুন অধ্যায়
২০২৩ সালের নির্বাচনের পর এরদোয়ান তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। গোয়েন্দা অঙ্গনের নেপথ্য ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি এখন তুরস্কের বৈদেশিক নীতির অন্যতম প্রধান মুখ।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ খাতে তার প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদার বাইরেও তিনি তুরস্কের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব।
ঢাকা সফরের গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও তুরস্কের অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করাই হাকান ফিদানের ঢাকা সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের প্রশ্নে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ফিদানও এই সংকটে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের পক্ষে তুরস্কের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ
তুরস্কে এরদোয়ান-পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই সামনে আসছে হাকান ফিদানের নাম। শান্ত স্বভাব, কৌশলী নেতৃত্ব, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং প্রেসিডেন্টের আস্থাভাজন হিসেবে তার অবস্থান তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জাতীয় নেতা হিসেবে আলোচনায় রেখেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের যে কৌশল আঙ্কারা অনুসরণ করছে, তার অন্যতম প্রধান স্থপতি হাকান ফিদান। আর সেই কারণেই তাকে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পর তুরস্কের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।







