খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরও দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টিরই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি।
কেবল দুর্বল ব্যাংক নয়, এবার আর্থিক সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, উত্তরা ব্যাংক ও বিদেশি মালিকানাধীন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকেরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণ বেড়েছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই ৪৪টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। ফলে মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত বকেয়া ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ কম দেখিয়েছিল, যা পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে গোপন খেলাপি ঋণ হিসেবে উদঘাটিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য চাপে থাকায় ঋণ আদায় ব্যাহত হচ্ছে, যা খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আরও অবনতি দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে চারটিরই আর্থিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। গত তিন মাসে এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা বেড়ে মোট দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ ৭৮৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৪৫.৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ। এছাড়া রূপালী, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি চাপে বেসরকারি খাত গত তিন মাসে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। মার্চ প্রান্তিক শেষে ৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টিতেই খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা বেড়ে ৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে শীর্ষে রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকায় (মোট ঋণের ৬৩ শতাংশ)। এরপরই রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (৩,৫১৪ কোটি টাকা), এক্সিম ব্যাংক (৩,৩২০ কোটি টাকা) ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (২,৯৪২ কোটি টাকা)।
এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ মূলধন সূচকে ভালো অবস্থানে থাকা ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। কেবল বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, এই তিন মাসে বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নেপথ্যে যেসব কারণ বলছেন ব্যাংকাররা মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে ব্যবসার প্রসার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে বড় ঋণগ্রহীতারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খান খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে পাঁচটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, কঠোর নজরদারির কারণে আগে গোপন রাখা খেলাপি ঋণগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে। দ্বিতীয়ত, ঋণ স্থগিতাদেশ ও বিলম্বে পরিশোধ সুবিধার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া। এছাড়া মূল্যস্ফীতি, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি ও বিশ্ব বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটার কারণে নগদ প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। সেই সাথে ঋণ মূল্যায়নে সুশাসনের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংস্কৃতি গড়ে ওঠাও এর জন্য দায়ী বলে তিনি মন্তব্য করেন।







