রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে এক ব্যতিক্রমী আমবাগান এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্তের দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বাগানটিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৩০ জাতের আম। বিভিন্ন রঙ, আকৃতি ও স্বাদের এসব আম দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার অনেকে নতুন জাতের চারা সংগ্রহের আগ্রহও প্রকাশ করছেন।
বাগানটির মালিক হানিফ আলী মণ্ডল। প্রচলিত আম চাষের পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে তিনি বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি জাতের আম নিয়ে গবেষণামূলক চাষাবাদ করে আসছেন। বর্তমানে তাঁর বাগানে ৩০ ধরনের আম রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি জাতের।
সম্প্রতি বাগানটি ঘুরে দেখা যায়, অনেক গাছে ফলের ভারে ডাল নুয়ে পড়েছে। লাল, বেগুনি, হলুদ ও সবুজ রঙের নানা জাতের আম দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। এসব আমের অনেকগুলোই আকার ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে দেশের প্রচলিত আমের চেয়ে ভিন্ন।
রাজশাহী অঞ্চলে বর্তমানে আমের মৌসুম পুরোদমে চলছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ক্ষীরশাপাতি (হিমসাগর) ও হাঁড়িভাঙ্গা আম। তবে হানিফ মণ্ডলের বিশেষ আগ্রহ দেরিতে পাকে এমন জাতের আম চাষে। তাঁর মতে, মৌসুমের শেষ দিকে আমের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারদর বেড়ে যায়, ফলে কৃষকেরা বেশি লাভবান হতে পারেন।
হানিফ মণ্ডল জানান, তাঁর বাগানে আম্রপালি, বারি আম-৪, গৌড়মতি, বারি আম-১১, হাঁড়িভাঙ্গা, বারি আম-১৬, কাটিমন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ক্ষীরশাপাতি, ফজলি, আশিনা, লক্ষণভোগ, কিউজাই, কিং অব চাকাপাত, চিয়াং মাই, রেড পামার, থ্রি টেস্ট, কেইট, টমি অ্যাটকিন্স, সূর্য ডিম, অম্বিকা, অস্টিন ম্যাঙ্গো, অরুনিকা, কাঁচামিঠা, ব্ল্যাক স্টোন, অল টাইম রেড, ল্যাংড়া, দুধসর, নাম ডক মাই ও গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আম রয়েছে।
শুধু আম নয়, বাগানটিতে মাল্টা, আনার ও পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলগাছও রয়েছে। বিশেষ করে হলুদ রঙের মাল্টা দেখতে অনেকেই সেখানে যান। ফলে বাগানটি ধীরে ধীরে একটি স্থানীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
গোদাগাড়ী উপজেলা থেকে বাগান দেখতে আসা সাব্বির রহমান বলেন, “আমাদেরও আমবাগান রয়েছে। এখানে বিভিন্ন বিদেশি জাতের আম দেখতে এসেছি। গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোসহ কয়েকটি জাত বেশ ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে এসব জাতের চারা সংগ্রহের ইচ্ছা আছে।”
আরেক দর্শনার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহবুব আলম বলেন, “বাগানটি ঘুরে দেখে ভালো লাগছে। শুধু আম নয়, বিভিন্ন ফলের চাষও হচ্ছে এখানে। নতুন কিছু করার আগ্রহ থেকেই আমরা দেখতে এসেছি।”
নিরাপদ ফল উৎপাদনের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন হানিফ মণ্ডল। বাগানের অনেক আম বিশেষ কাগজের ব্যাগ দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, যা কৃষিবিজ্ঞানে ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে ফলমাছির আক্রমণ কমে এবং কীটনাশকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
তিনি জানান, ব্যাগিংয়ের ফলে ফল নিরাপদ থাকে এবং দীর্ঘ সময় ওষুধ প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। এতে ভোক্তারা নিরাপদ আম পান। তাঁর উৎপাদিত আমের একটি বড় অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি হয়।
স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখছে এ বাগান। হানিফ মণ্ডলের অ্যাগ্রো ফার্মে নিয়মিত সাত থেকে আটজন শ্রমিক কাজ করেন।
মৌসুমভেদে কাজের চাপ বাড়লে শ্রমিক সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, ব্যাগিংসহ বিভিন্ন কাজে স্থানীয় মানুষ যুক্ত রয়েছেন।
হানিফ মণ্ডল বলেন, নতুন জাতের আমের ফলন, স্বাদ ও বাজার সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর আশা, দেরিতে পাকে এমন নতুন জাতের আমের চাষ বাড়লে কৃষকের আয় যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি আমের মৌসুমও দীর্ঘায়িত হবে। এর মাধ্যমে রাজশাহীর আমচাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
