দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর অভ্যন্তরে একটি বড় ধরনের টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারের ব্যয়সংকোচন ও স্বচ্ছতা নীতিকে উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী চক্র একটি কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক দরপত্রে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নরসিংদীর মাধবপুর–মনোহরদী সাবস্টেশন স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সূত্রের দাবি, পিজিসিবির কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর একটি সিন্ডিকেট “এনার্জিপ্যাক বাংলাদেশ” নামের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) আকারে দরপত্রে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববাজারে স্বনামধন্য চীনা কোম্পানিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটিকে একটি অখ্যাত স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে জোটবদ্ধ করে “জয়েন্ট ভেঞ্চার” আকারে সামনে আনার মাধ্যমে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আড়ালে রাখা হচ্ছে।
এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন অংশীদার চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা ইতোমধ্যে তদন্তে নেমেছে বলে জানা গেছে। তারা সংশ্লিষ্ট অনিয়ম, অর্থ লেনদেন এবং গোপন কমিশনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছে।
এনার্জিপ্যাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সূত্রের দাবি, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পে এনার্জিপ্যাকের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ, অগ্রিম অর্থ অপব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে পিজিসিবি বোর্ড ৬১২/২০২৫ নম্বর সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে।
বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কোনো সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, পিজিসিবির অভ্যন্তরের একটি প্রভাবশালী চক্র এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করছে।
এনার্জিপ্যাক নাকি “রিভারি পাওয়ার অ্যান্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং” নামের একটি নতুন ও তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে দরপত্রে অংশ নিচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এটি মূলত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি কৌশল।
চীনা কোম্পানিগুলোকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ
দরপত্রে মোট পাঁচটি কনসোর্টিয়াম অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে চারটি চীনের স্বনামধন্য কোম্পানি:
CCCE–CMC–ETERN কনসোর্টিয়াম
SEPCO-1 & ZIC গ্রুপ
শানডং টাইকাই পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং
TBEA Co. Ltd.
অভিযোগ রয়েছে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে “টেকনিক্যালি নন-রেসপন্সিভ” দেখিয়ে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে বিতর্কিত যৌথ উদ্যোগটি সুবিধা পায়।
সমালোচকদের মতে, এটি একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ একটি চক্র অবৈধ সুবিধা ও কমিশন লাভের উদ্দেশ্যে দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।
অতীত কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
এনার্জিপ্যাকের বিরুদ্ধে অতীতে ঢাকা ও পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পসহ একাধিক কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ রাখার অভিযোগ রয়েছে। সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েকটি চুক্তি বাতিল করা হয় বলেও জানা গেছে
একাধিক সাবস্টেশন প্রকল্পে অর্থনৈতিক অনিয়ম ও অগ্রগতির স্থবিরতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি ও উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে বড় প্রকল্প দেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা যেমন এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ও সহায়তা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে চীনের মতো বড় উন্নয়ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে পিজিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
এনার্জিপ্যাকের পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অতীতে দাবি করা হয়েছে, তারা দেশে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানের ট্রান্সফরমার রপ্তানিতে







