নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন চার দিনব্যাপী আলোচনার পর বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। তবে সীমান্তসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
বাংলাদেশ পক্ষ থেকে সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি, ১৫০ গজের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ এবং অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহারের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। তবে ঢাকার সূত্রগুলোর দাবি, এসব বিষয়ে কার্যকর কোনো সমাধানে ভারত রাজি হয়নি।
যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়ায় প্রশ্ন
বৈঠক শেষে সাধারণত যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও এবার তা হয়নি। পরে পৃথকভাবে বিবৃতি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিছু স্পর্শকাতর ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান এক না হওয়ায় যৌথ ব্রিফিং এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
বিবৃতিগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই “পারস্পরিক সম্মতি”, “প্রচেষ্টা জোরদার” বা “সহযোগিতা বাড়ানো হবে”—এ ধরনের কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বা বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত আসেনি।
সীমান্ত হত্যা ইস্যু অমীমাংসিত
সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ পক্ষ জোরালোভাবে উত্থাপন করে। বিজিবি সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার আহ্বান জানায়।
তবে উভয় পক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থার কথা বললেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার মতো কোনো বাধ্যতামূলক অঙ্গীকার আসেনি। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ কী হবে, তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
পুশইন ইস্যুতে অচলাবস্থা
পুশইন ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এবারও ভিন্ন রয়ে গেছে। বাংলাদেশ দাবি করেছে, ভারত যাচাই-বাছাই ছাড়াই অবৈধ নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত বলেছে, তারা শুধুমাত্র অবৈধ অবস্থানকারী ব্যক্তিদের ফেরত পাঠাচ্ছে। এ বিষয়ে যৌথ যাচাই ব্যবস্থা বা বাধ্যতামূলক কাঠামো নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান
বাংলাদেশ পক্ষ সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা ও অস্ত্র চোরাচালানের বিষয়টি উত্থাপন করে। বিজিবি যৌথভাবে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের প্রস্তাব দেয়।
বিএসএফ তাদের “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও চোরাচালান নেটওয়ার্ক ভাঙতে কোনো যৌথ অভিযান বা নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি।
রোহিঙ্গা ও অবৈধ অভিবাসন
বিএসএফ অবৈধ অভিবাসন ইস্যু তুলে ধরলে বিজিবি জানায়, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ভারতে প্রবেশ করতে দেয় না এবং মানবপাচার প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
উভয় পক্ষ মানবপাচার রোধে একমত হলেও কোনো কার্যকর বাস্তব কাঠামো নির্ধারণ হয়নি।
সীমান্ত বেড়া ও ১৫০ গজের লঙ্ঘন
বাংলাদেশ ১৫০ গজ সীমান্ত এলাকার মধ্যে বিএসএফের অনুমতি ছাড়া নির্মিত ৩৯টি অবকাঠামোর বিষয় তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী উভয় পক্ষের সম্মতি ছাড়া এ ধরনের নির্মাণ বৈধ নয়।
তবে ভারত এসব অবকাঠামো অপসারণ বা সংশোধন নিয়ে কোনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়নি।
সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নদী ইস্যু
পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বেগ জানালেও ভারত নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি।
অভিন্ন নদীর পানি ও সেচ প্রকল্প নিয়ে আলোচনায় বিষয়গুলো যৌথ নদী কমিশনের আওতায় আলোচনার কথা বলা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান আসেনি।
তথ্য বিভ্রাট ও প্রচারণা
ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগও বাংলাদেশ পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়। উভয় পক্ষ এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তব কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
মূল প্রশ্ন থেকেই গেল
চার দিনের বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ সহযোগিতা ও আস্থার কথা বললেও বাংলাদেশ যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উত্থাপন করেছে, তার অধিকাংশই অনির্ধারিত রয়ে গেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পুশইন রোধ, চোরাচালান দমন কিংবা সীমান্ত অবকাঠামো নিয়ে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
ফলে দিল্লির এই বৈঠককে অনেকেই দেখছেন এমন একটি কূটনৈতিক আলোচনা হিসেবে, যেখানে সমস্যাগুলো আবারও আলোচিত হয়েছে, কিন্তু বাস্তব সমাধান অধরাই থেকে গেছে। আগামী ঢাকার বৈঠকেও একই ধরনের জটিলতা থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।







