দেশে মাদক বিস্তার, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতা, একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই এবং অপহরণের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও তীব্র হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই জনতা নিজেরাই বিচার করার আহ্বান জানাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি উদ্বেগজনক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে যে ভঙ্গুরতা তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তা কাটিয়ে ওঠার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও সহিংস অপরাধের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের মধ্যে এখনো এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভীতি কাজ করছে, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রয়োগে তারা পিছিয়ে থাকছে
বিশেষজ্ঞরা আরও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। তাদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থেকে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই চার মাসে দেশে এক হাজার ২০২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ৫৯৬টি, ডাকাতি ১৬০টি এবং অপহরণ ১৯৫টি। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ভায়োলেন্স, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার উচ্চমাত্রার চিত্র উঠে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক মনে করেন, অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বিধাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তার, ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন এবং সামাজিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত হয়েছে, যা জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণের একাধিক ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি কিছু ঘটনায় লাশ খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে দেওয়া কিংবা শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করার মতো নৃশংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা। বস্তি উচ্ছেদ অভিযান, অপরাধী গ্রেপ্তার কিংবা বিশেষ অভিযানের সময় রাজধানী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কিছু ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের যানবাহন ভাঙচুর এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে লুট হওয়া ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩২৮টি উদ্ধার হয়নি। একইভাবে লুট হওয়া প্রায় সাড়ে ছয় লাখ গোলাবারুদের একটি বড় অংশও এখনো নিখোঁজ রয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত উদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতে সহিংস অপরাধের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে পুলিশের মনোবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মাঠপর্যায়ে মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পুলিশের জন্য নতুন যানবাহন কেনা এবং অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, সামাজিক অস্থিরতার কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
