চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সবুজ চা-বাগানের পাশাপাশি পাহাড়ি টিলাজুড়ে এবার আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশেষ করে দেশজুড়ে জনপ্রিয় হানিকুইন জাতের আনারসের উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে উৎপাদনের আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে চাষিদের কাছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ভালো ফলন হলেও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আনারস নষ্ট হয়। উৎপাদন বেড়ে গেলে বাজারে দাম কমে যায়, ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হয় তাদের।
মঙ্গলবার শ্রীমঙ্গলের একটি আনারস বাগানে কথা হয় বাগানমালিক লেবু মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে আনারসের দাম মোটামুটি ভালো থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে সব সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। ফলন বেশি হলে দাম কমে যায় এবং তখন উৎপাদন খরচ তুলতেও হিমশিম খেতে হয়।
একই বাগানের শ্রমিক সুহেল মিয়া জানান, একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আনারস পেকে গেলে দ্রুত বাজারজাত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এলাকায় হিমাগার থাকলে চাষি, ব্যবসায়ী এবং শ্রমিক—সবারই উপকার হতো।
আনারস ব্যবসায়ী নির্মল আদিত্য বলেন, স্থানীয় আড়তগুলোতে প্রতিদিন প্রায় অর্ধকোটি টাকার আনারস কেনাবেচা হয়। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংরক্ষণ সুবিধার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে একটি আধুনিক হিমাগার স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও বড়লেখার পাহাড়ি টিলায় মোট ১ হাজার ২২৩ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও উপযুক্ত পরিবেশের কারণে এমডি, হানিকুইন ও জায়েন্ট কিউ জাতের প্রায় ২২ হাজার ৭৭৪ মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, চায়ের জনপদে আনারস এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। পাহাড়ি টিলায় উৎপাদিত এই সোনালি ফল শুধু কৃষকের স্বপ্নই নয়, ভবিষ্যতে জেলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন আহমেদ জানান, উপজেলায় বর্তমানে ৪২৫ হেক্টর জমিতে আনারসের আবাদ হয়েছে। পাহাড়ি টিলার মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া আনারস চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছর আবাদ বাড়ছে। এর ফলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষির বাণিজ্যিকীকরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তবে তিনি বলেন, ভরা মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে অনেক সময় কৃষকরা ন্যায্য দাম পান না। আনারস সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি জুস, জ্যাম ও অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য তৈরির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
