তারল্য সংকটে পড়া ইসলামী ব্যাংককে নতুন টাকা ছাপিয়ে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বিশেষ তারল্য সহায়তাকে ঘিরে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকটির কার্যক্রম সচল রাখা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে গ্রাহকদের ব্যাপক আমানত উত্তোলনের চাপ সৃষ্টি হয়। একই সময়ে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) বজায় রাখতে ব্যর্থ হয় এবং গ্রাহকদের নগদ অর্থ পরিশোধে সংকটে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চায়। পরে ধাপে ধাপে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে কোনো ব্যাংককে ঋণ দিলে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ একই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে একটি মাত্র ব্যাংককে সীমিত পরিসরে দেওয়া এই সহায়তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে খুব বেশি দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌকিফ আহমেদ বলেন, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সংকট নিরসনই এই সহায়তার মূল উদ্দেশ্য। দেশের ৬২টি ব্যাংকের মধ্যে একটি ব্যাংককে দেওয়া বিশেষ সহায়তা সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে না। তাত্ত্বিকভাবে অর্থের সরবরাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে, তবে বাস্তবে এর প্রভাব সাধারণত সীমিত থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ বা শেষ আশ্রয়দাতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ। কোনো ব্যাংক হঠাৎ তারল্য সংকটে পড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো সাময়িক সহায়তা দিয়ে সেটিকে সচল রাখা। তিনি বলেন, এটি কোনো অনুদান নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকটিকে ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে।
মুজেরী আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক এবং দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ এই ব্যাংকের মাধ্যমে আসে। এমন একটি ব্যাংক সংকটে পড়লে পুরো ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই বৃহত্তর আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থেই এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন অর্থ বাজারে প্রবেশ করলে তাত্ত্বিকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংককে সহায়তা দেওয়া ছাড়া কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি জানান, ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ বা অপরিহার্যতার নীতির ভিত্তিতে বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যাতে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং অপ্রয়োজনীয় আমানত উত্তোলনের প্রবণতা কমে।
তিনি আরও বলেন, এই সংকট সাময়িক। ইসলামী ব্যাংক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফিরে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে না।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২২ সালের শেষ দিকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির তথ্য প্রকাশের পর আমানত উত্তোলন বেড়ে যায়। তখনও বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে কিছু ব্যাংক চলতি হিসাবের ঘাটতি রেখেও লেনদেনের সুযোগ পায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হলেও নতুন করে তারল্য সহায়তা না দেওয়ার নীতি দীর্ঘদিন টেকেনি। বিভিন্ন ব্যাংকে তারল্য সংকট বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও বিশেষ সহায়তা দিতে বাধ্য হয়। বর্তমান সরকারও শুরুতে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংককে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। তবে ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ তারল্য সহায়তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এরপর এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি এবং ইসলামী ব্যাংক ৯ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এবি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক মিলিয়ে মোট ৭৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) ও ১৭(১)(বি) ধারার আওতায় ৯০ দিনের জন্য সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এই ঋণ দেওয়া হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় এটি ‘ওভারনাইট-ওডি’ সুবিধা নামে পরিচিত। ঋণের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো সমমূল্যের ডিমান্ড প্রমিসরি নোট জমা দেয়। শর্ত অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক দেউলিয়া বা অবসায়িত হলে তার সম্পদ বিক্রির অর্থ থেকে সবার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
