সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম টেলিগ্রামে বাংলাদেশের ভোটার তালিকা অবাধে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এসব তালিকায় নাগরিকদের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, পেশা ও ভোটার নম্বরসহ সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়ায় তথ্য নিরাপত্তা ও অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তথ্য যাচাই ও ডিজিটাল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর অনুসন্ধানভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা সামাজিক মাধ্যমে মাত্র ৩০ থেকে ২৫০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপে আসনভিত্তিক এবং সারাদেশের ভোটার তালিকার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এমনকি এসব তালিকা বিক্রির জন্য ফেসবুক বিজ্ঞাপনও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি ক্ষেত্রে ২৫০ টাকা পরিশোধের পর ক্রেতাকে গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে বিভাগভিত্তিক ফোল্ডারে সাজানো ভোটার তালিকা সরবরাহ করা হয়। পরে যাচাই করে দেখা যায়, সেখানে থাকা তথ্য নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ডিসমিসল্যাব আরও অন্তত ৫০০টির বেশি পোস্ট শনাক্ত করেছে, যেখানে ভোটার তালিকা বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপেও এসব তথ্য বিনামূল্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক প্রার্থীকে পিডিএফ আকারে ভোটার তালিকা সরবরাহ করা হয়েছিল, যেখানে ভোটারদের ছবি ছিল না। তার মতে, কোনো প্রার্থী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এই তথ্য অন্য কারও কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করে থাকতে পারেন। এছাড়া ভোটার তালিকা প্রিন্ট করার সময় কম্পিউটার দোকান থেকে তথ্য কপি হয়ে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের তথ্য ফাঁস নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, এসব তথ্য ব্যবহার করে অপরাধীরা ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি, ব্যাংক জালিয়াতি, অনলাইন অ্যাকাউন্ট দখল কিংবা অন্যের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। এতে নাগরিকরা আর্থিক, মানসিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক মইনুল হোসেন বলেন, এনআইডি, ভোটার তালিকা, জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত তথ্যের মতো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে তথ্য সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং নিয়মিত নিরাপত্তা অডিটের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক তথ্য সামাজিক মাধ্যমে বেচাকেনা হওয়া তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দ্রুত তদন্ত করে তথ্য ফাঁসের উৎস শনাক্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।







