মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তুরস্কের কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের কয়েক ডজন জেট ইঞ্জিন বিক্রির পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যেই কংগ্রেসের কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা আপত্তি তুলেছেন। তবুও ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটো জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যেই চুক্তিটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিক্রির জন্য নির্ধারিত জেট ইঞ্জিনগুলো তৈরি করবে মার্কিন প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক (GE)। এসব ইঞ্জিন তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নয়নাধীন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান KAAN-এ ব্যবহার করা হবে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তুরস্কের নিজস্ব যুদ্ধবিমান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ গতি পাবে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে বড় অগ্রগতি হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কংগ্রেসে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, মানবাধিকার এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনার পরই এই রপ্তানি লাইসেন্স অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনের আগে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
তবে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের একটি অংশ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিকস অভিযোগ করেন, ২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পরও তুরস্কের সঙ্গে এমন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কেন বাড়ানো হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশাসন পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে প্রশাসন কংগ্রেসের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এছাড়া প্রতিনিধি ক্রিস পাপাশও চুক্তির সমালোচনা করে বলেন, মার্কিন আইন লঙ্ঘনের পরও এরদোগান সরকারকে কোনোভাবেই পুরস্কৃত করা উচিত নয়। অন্যদিকে প্রতিনিধি ডিনা টাইটাস জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে তিনি কংগ্রেসে জেট ইঞ্জিন বিক্রি ঠেকাতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে কংগ্রেস চাইলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে যৌথ প্রস্তাব এনে এই বিক্রয় চুক্তি আটকে দিতে পারে। তবে সেটি কার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এমনকি বিল পাস হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাইলে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ভেটো দিতে পারবেন।
এদিকে জেট ইঞ্জিন বিক্রি, এফ-৩৫ কর্মসূচি এবং তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমি সম্ভবত এমন কিছু করতে যাচ্ছি, যা তাদের অনেক খুশি করবে।” তার এই মন্তব্যকে তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তুরস্কের KAAN যুদ্ধবিমান প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশটির বিমানবাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে একটি পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভরতা কমানো। যদিও তুর্কি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বিদ্যমান এফ-১৬ বহর পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে এখনো কয়েক বছর সময় লাগবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং দেশটিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। সেই সঙ্গে কংগ্রেস আইন পাস করে, যাতে এস-৪০০ ব্যবস্থা বহাল থাকা পর্যন্ত তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি নিষিদ্ধ থাকে। বর্তমান জেট ইঞ্জিন বিক্রির উদ্যোগকে সেই টানাপোড়েনের পর দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন গতি আসবে এবং ন্যাটো জোটের ভেতরে আঙ্কারা-ওয়াশিংটন সম্পর্কেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে কংগ্রেসের আপত্তি এবং এস-৪০০ ইস্যু ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক চুক্তির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে এখনো বড় একটি অনিশ্চয়তা হয়ে রয়েছে।
