ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পলাতক প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনকে ঘিরে তদন্তে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ইতালীয় গণমাধ্যমের দাবি, শাহাদাত শুধু এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারীই নন, তিনি রোমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সম্ভাব্য সহযোগীদের খোঁজে তদন্ত শুরু করেছে ইতালির পুলিশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাহাদাত হোসেন নিজেকে বিএনপির রোম শাখার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে তাঁর বিভিন্ন ছবিও রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি দলীয় সদস্য তালিকায়ও তাঁর নাম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ ছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, পলাতক অবস্থায় তিনি পরিচিত কোনো রাজনৈতিক সহকর্মী বা ঘনিষ্ঠজনের সহায়তা পেয়ে থাকতে পারেন। তবে পুলিশ স্পষ্ট করেছে যে, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ খুঁজতে অভিযুক্ত শাহাদাতের একটি পুরোনো ফেসবুক পোস্টও গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘কেউ একা মারা যায় না। সবসময় তার সঙ্গে আরেকজনও মারা যায়। মৃত্যু এলে নিজের প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে কাউকে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে না হয়।’ তদন্তকারীরা এই রহস্যময় পোস্টটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ৯টার কিছু পরে শাহাদাত একটি ধারালো দা (ম্যাশেটি) নিয়ে ওই প্রবাসী পরিবারের বাসায় প্রবেশ করেন। ভেতরে ঢুকেই তিনি প্রথমে আরজু বেগম ও তাঁর আট বছর বয়সী মেয়ে আরোয়াকে কুপিয়ে হত্যা করেন। এরপর আরজু বেগমের স্বামী কামাল উদ্দিনকেও একইভাবে হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর তিনজনের মরদেহ বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে পুলিশের ধারণা।
ভয়াবহ এই হামলার সময় আকস্মিকভাবে বাসায় এসে বাবা-মা ও বোনকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন দম্পতির ২০ বছর বয়সী ছেলে আমির। তবে হামলাকারীর সাথে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তিনি গুরুতর জখম হন। বর্তমানে রোমের জেমেলি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন আমির। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রক্তাক্ত অবস্থায় চিৎকার করে আমির বারবার বলছিলেন, ‘সে আমার মাকে হত্যা করেছে, আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে। এটা শাহাদাতই করেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আগোস্তিনো জানান, সেদিন রাতে হঠাৎ চিৎকার শুনে বাইরে বের হয়ে তিনি দেখেন, আমির রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন এবং এক ব্যক্তি তাঁর ওপর হামলা চালাচ্ছে। প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে ওই ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়। নৃশংস এই ট্রিপল মার্ডারের পর থেকেই শাহাদাত হোসেন সম্পূর্ণ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতার করতে কাসালোত্তি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি ইতালিজুড়ে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে দেশটির পুলিশ।







