সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি বাতিলের দাবিতে ২০২৪ সালের ৭ জুলাই শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। আন্দোলনের সপ্তম দিনে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি থেকে সরে এসে এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। তাদের দাবি ছিল, সব গ্রেডে বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটা ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাস করতে হবে।
একই দাবিতে পরদিন ৮ জুলাইও ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিন রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, নীলক্ষেত, বাংলামোটর ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগারগাঁও মোড় এবং ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নেন। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক ও মোড়ে অবরোধ ও বিক্ষোভের ফলে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে পুরো ঢাকা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
কর্মসূচির মধ্যেই সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য আন্দোলনের তিন সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, নাহিদ ইসলাম ও সারজিস আলমকে শাহবাগ থানায় ডাকা হয়। প্রায় ৩০ মিনিট আলোচনা শেষে তারা অবরোধস্থলে ফিরে আসেন। এ সময় হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তাদের ডাকা হয়েছিল।
এ বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “কোনো আলাপ বা গোলটেবিল হবে না। আমরা অনেক আলাপ করেছি, আলাপের দিন শেষ হয়ে গেছে। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি প্রহসন। এবার আর প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না।” তিনি আরও বলেন, সরকার চাইলে নতুন পরিপত্র জারি করে সব গ্রেডে কোটার সংস্কার করতে পারে।
সেদিন কোটার বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবনের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে এভাবে আন্দোলন করা সাবজুডিস বিষয়। সরকার এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলতে পারে না।”
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটাবিষয়ক সিদ্ধান্ত আদালতের, এ বিষয়ে সরকারের কিছু করার নেই। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী মন্তব্য করেন, কোটা আন্দোলনের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
এক দফা দাবি
৭ জুলাই চার দফা দাবি থেকে সরে এসে আন্দোলনকারীরা এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাস করতে হবে। দাবি মেনে নিলে আজই আমরা পড়ার টেবিলে ফিরে যাব।”
একই সঙ্গে ৮ জুলাই সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্রধর্মঘট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। মধ্যরাতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “দাবি মেনে না নিলে ১০০ শতাংশ কোটা দিয়ে দেন। ঘোষণা করে দেন, এটা কোটাধারীদের দেশ। আমাদের আদালত দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা সংবিধানস্বীকৃত বিষয়ে আন্দোলন করছি।”
রাজধানীজুড়ে আন্দোলন
আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগারগাঁও মোড় অবরোধ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর, ২ নম্বর গেট ও লালখানবাজার এলাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ৮ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেললাইন অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। ময়মনসিংহে শিক্ষার্থীরা অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে রেলপথ অবরোধ করেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থীরা পৃথকভাবে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।







