যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বলে জোর গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার প্রায় সাত মাস পর অবশেষে জনসমক্ষে এলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শেষ বিদায়ের মিছিলে অংশ নিতে এসে তিনি ক্যামেরাবন্দি হন। এর মাধ্যমে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি যে বেঁচে আছেন, তা নিশ্চিত হওয়া গেল।
আহমাদিনেজাদের অফিশিয়াল ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত টেলিগ্রাম চ্যানেল ‘দলাত-ই বাহার’-এ কিছু ছবি প্রকাশের পাশাপাশি ইরানি ও বিশ্ব গণমাধ্যমে এই ঐতিহাসিক জানাজায় তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তীব্র বিমান হামলার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন এবং বিশ্বজুড়ে তাঁর মৃত্যুর জোরালো দাবি উঠেছিল।
কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে খামেনির জানাজায় সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য এই সমস্ত দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুল প্রমাণ করেছে। দীর্ঘদিন পর জনসমক্ষে এসে ভিড়ের মাঝে মিশে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাঁর পরিষ্কার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ পাওয়ায় এটি এখন বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মূলত খামেনির মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া নতুন নেতৃত্বের অধীনে ক্ষমতার পরিবর্তনের এই অস্থির সময়ে কোণঠাসা হয়ে পড়া অভিজাতদের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াই হিসেবেই তাঁর এই উপস্থিতিকে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অথচ ক্ষমতার মেয়াদকালে ও পরবর্তী সময়ে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তাঁর তীব্র কোন্দল ও উত্তাল এক ইতিহাস রয়েছে।
মাহমুদ আহমাদিনেজাদের রাজনৈতিক উত্থান মূলত শুরু হয়েছিল ইরানের মূল शासनব্যবস্থা ও আলী খামেনির পূর্ণ এবং অবিচল পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়ে (২০০৫-২০০৯)। এমনকি, ২০০৯ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় খামেনি জুমার নামাজের খুতবা ব্যবহার করে আহমাদিনেজাদ প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যা সে সময় ঐতিহাসিক ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামক গণবিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায় ও শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বৈধতাকে নাড়িয়ে দেয়।
তবে ২০১০ সালের মধ্যেই তাঁদের এই জোট ভেঙে যায়। তৎকালীন গোয়েন্দা মন্ত্রী হেইদার মোসলেহির বরখাস্তের ঘটনা কেন্দ্র করে এই ফাটল চরম রূপ নেয়। আহমাদিনেজাদ মোসলেহিকে পদত্যাগে বাধ্য করলেও খামেনি পাল্টা ডিক্রি জারি করে তাঁকে পুনর্বহাল করেন। এই পরম ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অবাধ্যতা প্রদর্শন করে আহমাদিনেজাদ টানা ১১ দিনের জন্য নিজের বাসভবনে ওয়াকআউট বা কর্মবিরতি পালন করেছিলেন এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী কাজ স্থবির করে দিয়েছিলেন।
এই তিক্ত অবাধ্যতার কারণে শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বৃত্তে আহমাদিনেজাদ স্থায়ীভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের পর খামেনির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ তাঁকে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।
