জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত দাবি করে জমা পড়া নতুন আবেদনগুলোর যাচাই-বাছাইয়ে প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে শনাক্ত করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এ ছাড়া প্রায় ৬০০ আবেদনে তথ্যগত অসংগতি, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন এবং শহীদের নামে আহত হিসেবে আবেদনসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও কারচুপি পাওয়া গেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শুরুর দিকে ‘জুলাই শহীদ ও আহত জুলাইযোদ্ধা’দের গেজেট প্রকাশের পর নতুন করে অনেকেই নিজেকে আহত ‘জুলাইযোদ্ধা’ দাবি করে আবেদন করেন। বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরে এমন ৩ হাজার ৩১৬টি নতুন আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮৮টি আবেদন পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে চূড়ান্ত তদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
দুই তদন্ত সংস্থার কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৯০ জন আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা মিলেছে। তাদের প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যার মধ্যে ৭৮৯ জনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ২৭৬ জনের এমআইএসভুক্তির কাজ চলমান এবং ২১০ জনের যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে, তদন্তে প্রায় ২০০টি আবেদন সরাসরি ভুয়া এবং জালিয়াতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বাকি প্রায় ৬০০ আবেদনের মধ্যে দুই তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে পারস্পরিক অসঙ্গতি, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন ও তথ্যগত ত্রুটি পাওয়া গেছে। এমনকি একজন শহীদের নামেও আহত হিসেবে আবেদন করার জঘন্য ঘটনা ধরা পড়েছে। যাচাইয়ে দেখা গেছে, অনেক আবেদনকারী আহত হওয়ার পক্ষে চিকিৎসার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ দিতে পারেননি।
এর আগে প্রকাশিত প্রথম দফার গেজেটে কিছু নাম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় ১৩ জন শহীদ এবং ২১৯ জন আহত জুলাইযোদ্ধার নাম বাতিল করা হয়েছিল। নতুন করে এমন বিতর্ক এড়াতে এবার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে আবেদনকারীদের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। বর্তমানে তিন ক্যাটেগরিতে গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ১৪,৩৭০ জন। নতুন ১,৫৯০ জন যুক্ত হলে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৫,৯৬০ জনে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, প্রকৃত আহত ব্যক্তিদেরই জুলাইযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আবেদনগুলো কঠোরভাবে যাচাই করা হয়েছে। কোনো ভুয়া আবেদনকারী যেন কোনোভাবেই গেজেটভুক্ত হতে না পারেন, সেটিই নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ৮৪৩ জন শহীদ এবং আহত তিন শ্রেণিতে মোট ১৪,৩৭০ জনের গেজেট প্রকাশ হয়েছে। শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা, মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং আবাসন সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে আহতদের শ্রেণিভেদে এককালীন আর্থিক সহায়তা, মাসিক ভাতা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, যাচাই-বাছাই শেষে শুধু প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদেরই গেজেটভুক্ত করা হবে। নতুন আবেদন জমা পড়া এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং অসত্য তথ্য দিয়ে কেউ গেজেটভুক্ত হয়ে থাকলে পরবর্তীতেও তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই ঐতিহাসিক তালিকা নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক না থাকে।
