আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইসিসের (আইএস) রণসঙ্গীত ও মতাদর্শের আদলে বাংলাদেশে বোমা তৈরি ও বিস্ফোরণের মহড়া দেওয়ার অভিযোগে ‘ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম’ নামের একটি মার্শাল আর্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শাহ আমানত সাবিরসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ৫ জুলাই উগ্রবাদে জড়িত থাকার সন্দেহে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ তাদের আটক করে আদালতে হাজির করলে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
সম্প্রতি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের মাধ্যমে শাহ আমানত সাবিরের মোবাইল থেকে উদ্ধার হওয়া ২ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে। গভীর রাতে ধারণ করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গেঞ্জি পরা এক যুবক নির্জন গ্রামীণ সড়কে পরপর তিনটি বোমার সলতেতে আগুন ধরিয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছেন। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে আইসিসের অফিসিয়াল মিডিয়া উইংয়ের বিখ্যাত রণসঙ্গীত ‘মাউকিবুন নুরী দা’আনা’ বাজতে শোনা যায়।
ভিডিওর একপর্যায়ে সাবিরকে মাথায় সাদাকালো পাগড়ি ও হাতে ধারালো দা নিয়ে ক্যামেরার সামনে এসে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে ইঙ্গিত করে বলতে শোনা যায়, “হে কুফফাররা, তোমরা জেনে রাখো, দ্রুতই আমরা তোমাদের ওপর বজ্রের মতো আঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইউনূস তুই তৈরি থাক! দেখা হবে ইনশাআল্লাহ! তাকবীর!” ভিডিওর পরবর্তী অংশে সাবির ও তাঁর সহযোগীদের ঘরের মেঝেতে বসে সুরা নিসা থেকে জিহাদ বিষয়ক একটি আয়াতের তিলাওয়াত করতে দেখা যায়।
গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে সাবির স্বীকার করেছেন যে, ভিডিওটি তাঁর সহযোগীরাই ধারণ করেছিলেন এবং আইএসের সঙ্গীত যুক্ত করে তা বিদেশে কারও কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, তিনি জঙ্গি অর্থায়নের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যশোরে কমল বিশ্বাস নামে এক হিন্দু ব্যক্তির ইজিবাইক ডাকাতির কথা স্বীকার করেছেন। নিজেদের পরিভাষায় একে ‘সারিয়া’ (অভিযান) আখ্যা দিয়ে সাবির দাবি করেন, কমল বিশ্বাস ইস্কন ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সাথে যুক্ত থাকায় এবং নিজেরা তীব্র আর্থিক অভাবে থাকায় এই হামলা বৈধ ছিল।
সাবির গ্রেফতারের পর উগ্রপন্থী হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর মতো অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা প্রথমে তাঁর পক্ষে ‘ইসলামবিদ্বেষের শিকার’ ও ‘নিছক মার্শাল আর্ট ট্রেনার’ দাবি করে মুক্তির ক্যাম্পেইন চালান। তবে ৮ জুলাই বোমার ভিডিও ও আইএসের সাথে সংশ্লিষ্টতার অকাট্য প্রমাণ প্রকাশ পাওয়ার পর অনেকেই সুর বদল করেন এবং সাবিরের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে তাঁর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ আমানত সাবির ঢাকা, খুলনা ও চাঁদপুরে ‘ফাতাহ কম্ব্যাট সিস্টেম’ নামে বিশ্বের প্রথম ‘শিরকমুক্ত, কুফরমুক্ত ও শরিয়াহভিত্তিক’ মার্শাল আর্ট একাডেমি পরিচালনা করতেন। তিনি নিয়মিত গণতন্ত্রকে কুফরি ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে পোস্ট করতেন। তাঁর একাডেমির শরীরচর্চার ভিডিওগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ডে আইসিসের অফিসিয়াল মিডিয়া ‘আজনাদ’ থেকে রিলিজ হওয়া ‘আলহামদুলিল্লাহ আল্লান্নাসরু’ ও ‘মাওকিবুন নূর’ এর মতো জিহাদি ও খেলাফত প্রতিষ্ঠার উসকানিমূলক গান ব্যবহার করা হতো।
