অনেক সময় মানুষ হাসতে হাসতে বা অবলীলায় অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঐতিহাসিক সত্য প্রকাশ করে ফেলে, যার অন্যতম বড় প্রমাণ ভারতীয় কংগ্রেসের নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য। ভারতের সংসদে মূলত আলোচনা শুরু হয়েছিল ক্ষমতাসীন দল বিজেপির পক্ষ থেকে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর কৃতিত্ব বা ক্রেডিট দাবি করাকে কেন্দ্র করে। বিজেপি নেতাদের সেই দাবির জবাব দিতে গিয়েই প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তাঁর দাদি ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একটি ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
বিজেপির কাউন্টার দিতে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী উল্লেখ করেন, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের শাসনামলে ইন্দিরা গান্ধী কীভাবে অত্যন্ত সফল ও চতুর কূটনীতির মাধ্যমে পাকিস্তানের মধ্যে বিভাজন ঘটিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন। এই বিশাল ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে ইন্দিরা গান্ধীর একক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো এর রাজনৈতিক ক্রেডিট বা কৃতিত্ব দাবি করেননি বলে প্রিয়াঙ্কা তাঁর বক্তব্যে জোর দেন।
লক্ষ্যণীয় বিষয় ছিল, প্রিয়াঙ্কা যখন সংসদে হাসিমুখে এই কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের কথা বলছিলেন, তখন কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন। অন্যদিকে, ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সংসদে বসে নীরব দর্শকের মতো এই বক্তব্য শুনে যেতে বাধ্য হন, যেখানে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ বা যৌক্তিকতা ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছিল না।
আসলে এই ইতিহাস ভারতের প্রতিটি প্রথম সারির রাজনীতিবিদের নখদর্পণে। ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে তাদের দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা ও সফলতার একটি বড় অংশ হিসেবেই দেখে থাকে। আর এই কারণেই তারা প্রায় ১ লাখ পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দিনটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে ‘বিজয় দিবস’ বা ‘ভিজয়া দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করে থাকে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানি সেনাদের সেই আত্মসমর্পণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
আজকের পরিবর্তিত বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ইতিহাস নতুন করে আলোচনার টেবিলে খুব বেশি জরুরি মনে না হলেও, এর অন্তর্নিহিত গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত মূলত বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে, তা গভীরভাবে অনুধাবন করার জন্য দিল্লির নীতিনির্ধারকদের এই ঐতিহাসিক স্বীকারোক্তি ও মনোভাব বুঝতে পারাটা অত্যন্ত জরুরি।
