যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে যাওয়ার পর পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালিতে খার্গ দ্বীপের দিকে অগ্রসর হওয়া একটি তেলবাহী ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পাশাপাশি ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় নতুন করে আঘাত হানা হয়েছে। এর জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে মার্কিন কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, টানা পঞ্চম দিনের অভিযানের অংশ হিসেবে খালি (তেলহীন) একটি ট্যাংকারকে অচল করে দেওয়া হয়েছে। একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় জাহাজটির ধোঁয়ার চিমনি লক্ষ্য করে হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মার্কিন বাহিনী।
এর আগে, গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালায়। একই দিন সকালে গ্রেটার তুনব দ্বীপে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রেও মার্কিন বিমান হামলা হয়।
এদিকে প্রথমবারের মতো ইরানের রাজধানী তেহরানেও হামলার খবর প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। বৃহস্পতিবার ভোরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার বিকট শব্দ শোনা যায়। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের মার্কিন হামলায় ৩৫ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
মার্কিন সশস্ত্রবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ হামলাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের সেই সামরিক সক্ষমতাগুলো, যেগুলো আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর দুই দেশের মধ্যে এখন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আভাজ শহরের আশপাশের চারটি স্থানে এবং হরমুজ প্রণালির প্রধান বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ ইরানের সিরিক ও কেশমের কাছাকাছি এলাকাতেও বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে।
গত শনিবার ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপ করলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব ধরনের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের হুমকি দেয় দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)।
এই তীব্র সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এটি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি হলেও সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো প্রায় ১২০ ডলারের সর্বোচ্চ দামের নিচেই রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান খুব শিগগিরই পরাজিত হবে। পেনসিলভানিয়ায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া। এর আগে মার্কিন আলোচকরা ইরানি প্রতিনিধিদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন যে তাদের চুক্তি করতেই হবে।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র হামলার পরিধি আরও বাড়াবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনে ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে’ হামলা চালানো হবে।
কয়েক সপ্তাহ আগে যুদ্ধাবসান ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ভেস্তে গেছে। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, সমঝোতার ধারাগুলো বাস্তবায়িত না হলে এই চুক্তি অর্থহীন। তিনি স্পষ্ট জানান, ইরান বর্তমানে ‘আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি অস্তিত্বের যুদ্ধ’ লড়ছে।
এমন চরম উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প বুধবার রাতে জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ হওয়া এক মার্কিন নাগরিককে ইরান দেশ ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ইরানের এই সদিচ্ছার পদক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কৃতজ্ঞ।
মানবাধিকার আইনজীবী জ্যারেড জেনসার জানান, মুক্তিপ্রাপ্ত ওই মার্কিন নাগরিকের নাম ডেনা কারারি, যিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ইরানে অবরুদ্ধ ছিলেন। ডেনা এখন নিরাপদে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাচ্ছেন এবং তাঁকে মুক্ত করার প্রচেষ্টার জন্য তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
